শনিবার   ০২ মার্চ ২০২৪ || ১৮ ফাল্গুন ১৪৩০

প্রকাশিত: ১২:৪৯, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

শতবর্ষের প্যাডেল স্টিমার: যাত্রার শেষ নাকি বিরতিতে?

শতবর্ষের প্যাডেল স্টিমার: যাত্রার শেষ নাকি বিরতিতে?
সংগৃহীত

সন্ধ্যা ৬ টা; স্টিমারের সাইরেন বেজে উঠলো। ডুবো ডুবো সূর্যের বিপরীতে নোঙর উঠলো স্টিমারের। সামনে স্রোতস্বিনী নদী আপন গতিতে এগিয়ে চলেছে, দুপাড়ে মানবজীবন চোখে ধরা দিচ্ছে অদ্ভুত সব রূপে। কানে হেডফোন, সেখানে হয়তো বাজছে শ্রেয়া ঘোষাল আর বাবুল সুপ্রিয়’র গান- ‘ফুটপাতে ভিড় জাহাজের ডাক ফিরে চলে যায়...।’

দেশের নৌ পরিবহনের একমাত্র ‘এন্টিক সার্ভিস’ রকেট স্টিমারে প্রথম ভ্রমণের দৃশ্যপট ঠিক এভাবেই স্মৃতির পাতায় লেপ্টে আছে। ‘রকেট স্টিমার’ বা ‘প্যাডেল স্টিমারের’ নাম অনেকেই শুনেছেন। যারা শোনেননি, তাদের বলি- নদীমাতৃক বাংলাদেশের যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে দেড়শ’ বছর ধরে চলা একটি জনপ্রিয় নৌযান প্যাডেল স্টিমার।

রকেট স্টিমারের জমজমাট যুগের শুরু

১৮৭৮ সালে রিভার স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি লিমিটেড নামের একটি ব্রিটিশ কোম্পানি প্যাডেল স্টিমার সার্ভিস চালু করে। ফ্লেমিংগো, ফ্লোরিকান, লেপচা, টার্ন, অস্ট্রিচ, বেলুচিসহ আরো কত কি নাম! বলা হয়ে থাকে ব্রিটিশ সরকার নাকি বরিশালে রেলপথ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু ব্যবসা হারানো ভয়ে স্টিমারের মালিকরা ব্রিটেন বসে কলকাঠি নেড়েছিলেন বলে বরিশাল রেলপথ যায়নি।

 

স্টিমারে প্রথম শ্রেণির কেবিন। ছবি: সংগৃহীত

স্টিমারে প্রথম শ্রেণির কেবিন। ছবি: সংগৃহীত

 

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে এর মালিকানা পায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। তখনও এসব স্টিমার বেশ জনপ্রিয় ছিল। একসময় কলকাতা পর্যন্ত যাওয়া-আসা করলেও দেশ স্বাধীনের পর কমে আসে যাত্রাপথ। নদীর নাব্যতা বিবেচনায় কখনো খুলনা, কখনো বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ পর্যন্ত চলাচল করতো। মধ্যখানে চাঁদপুর-বরিশাল ছিল নিয়মিত বিরতিস্থল।

তেরো নদীর বুকে বিশ ঘণ্টা

শাখা-প্রশাখাসহ প্রায় ১০০৮ নদ-নদীর দেশ বাংলাদেশ। প্যাডেল স্টিমার ভ্রমণে গিয়ে এর মধ্যে বেশ কয়েকটি চেনা নদীকে ছুঁয়ে যাওয়া সম্ভব। বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, মেঘনা, পদ্মা, ডাকাতিয়া, কীর্তনখোলা, বাঁশখালি, গাবখান নদী, সন্ধ্যা নদী, কালীগঙ্গা, কাতছা নদী, বালেশ্বর এবং পাঙ্গুচি- অন্ততপক্ষে এই তেরোটি নদীর বুক চিড়েই ঢাকা থেকে মোড়েলগঞ্জ পৌঁছাতো প্যাডেল স্টিমার।

বিআইডাব্লিউটিসি'র এই পরিবহনের কাগুজে নাম রকেট সার্ভিস। সদরঘাট থেকে মোড়েলগঞ্জ পর্যন্ত এই প্যাডেল স্টিমারে যেতে সময় লাগতো প্রায় ২০ ঘণ্টা। অনেকেই হাসেন, ধীরগতির এই জলযানের নাম কি করে রকেট হয়? কিন্তু একটা সময়ে এই প্যাডেল স্টিমারগুলোই ছিল দেশের সবচেয়ে দ্রুততম জলযান। সে কারণেই হয়তো এই সার্ভিসের নামকরণ করা হয়েছে রকেটের নামে!

 

অসংখ্য বাংলা সিনেমার শুটিং হয়েছে প্যাডের স্টিমারে। ছবি: সংগৃহীত

অসংখ্য বাংলা সিনেমার শুটিং হয়েছে প্যাডের স্টিমারে। ছবি: সংগৃহীত

 

বিখ্যাত ব্যক্তিরা চড়েছেন, হয়েছে সিনেমা

প্যাডেল ইঞ্জিনচালিত স্টিমারের প্রধান বৈশিষ্ট্য দুই পাশে প্রপেলার। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছাদের রেলিং ও দোতলার সম্মুখভাগ। অনেক বিদেশি শুধু এটাতে চড়তেই বাংলাদেশে আসতেন। প্যোডেল স্টিমারের যাত্রীর তালিকায় আছে কিছু বিখ্যাত ব্যক্তির নামও। ১৯৬১ সালে ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ এই নৌযানে চড়েন। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যুগোস্লাভিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান মার্শাল টিটোসহ দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মৃতি রয়েছে এ বাহনে চড়ার।

অসংখ্য বাংলা সিনেমার শুটিং হয়েছে প্যাডের স্টিমারে। তবে শুধুই প্যাডেল স্টিমারকে কেন্দ্রে রেখে ২০১৮ সালে নির্মিত হয় ‘কমলা রকেট’। কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের ‘মৌলিক’ ও ‘সাইপ্রাস’ নামক দুইটি গল্প অবলম্বনে সিনেমাটি পরিচালনা করেন নূর ইমরান মিঠু। চলচ্চিত্রের শুরু থেকে শেষ অবধি পুরোটাই শুটিং করা হয় স্টিমারে। ছিয়ানব্বই মিনিটের সেলুলয়েড যাত্রাপথে দেখানো হয় কমলা রঙের রকেটে চড়ে বসে সমাজের আপার ক্লাস, লোয়ার ক্লাস আর মৃত একটি লাশ।

একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি?

বিশ্বজুড়ে এই প্যাডেল স্টিমার আছে হাতেগোনা অল্প কিছু। বর্তমানে বাংলাদেশে আছে চারটি, এর মধ্যে তিনটি সচলযোগ্য। গতবছরের ১৭ সেপ্টেম্বর স্টিমার সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ হওয়ার ৭ মাস পর যাত্রী চাহিদার কারণে ঈদ উপলক্ষে দেখা যায় এই স্টিমার। যাত্রীর অভাবে আবারও প্যাডেল স্টিমার চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে আবার কবে যে ভেঁপু বাজিয়ে নদীর বুক চিরে চলতে দেখা যাবে, তা বলা মুশকিল।

বর্তমানে বাবুবাজার লাগোয়া বাদামতলী ঘাটে গেলেই দেখা মিলবে পিএস মাহসুদ ও পিএস লেপচার। বাকি দুটি নারায়ণগঞ্জ ডকওয়ার্ড ও কাঞ্চন ব্রিজের কাছে রয়েছে।

এমভি মধুমতির মাস্টার আব্দুল হাই বলেন, আমি একসময় একসময় পিএস মাসউদ চালিয়েছি। এ স্টিমার একসময় বাষ্পীয় ইঞ্জিনে চলত। নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে এক কয়লার ডিপোও ছিল। পিএস মাসউদকে ১৯৯০ সালের পরে ডিজেল ইঞ্জিনে রূপান্তর করা হয়। এগুলোর স্পিড নেই, মান্ধাতার আমলের, কিন্তু ঐতিহ্যবাহী। তবে কবে আবার সার্ভিসের ফিরে, তা বলা যাচ্ছে না।

সূত্র: ডেইলি-বাংলাদেশ

সর্বশেষ

জনপ্রিয়