শনিবার   ০২ মার্চ ২০২৪ || ১৮ ফাল্গুন ১৪৩০

প্রকাশিত: ১০:৫২, ৩০ জানুয়ারি ২০২৪

নারীর মর্যাদা, ‘সম্মাননার’ মর্যাদা,সার্বভৌমত্বের মর্যাদা

নারীর মর্যাদা, ‘সম্মাননার’ মর্যাদা,সার্বভৌমত্বের মর্যাদা
সংগৃহীত

এই তিন বিষয়ে আমি এই লেখায় কিছু কথা বলতে চাই। প্রথমে নারীর মর্যাদা। মানুষ হিসাবে কি নারী কি পুরুষ—সবাই সমমানুষ, সব মানবাধিকার সবারই প্রাপ্য, মানবমর্যাদায় জীবন যাপন করার সমঅধিকার সবারই রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেও এসব বিষয় উচ্চারিত হয়েছে। বাংলাদেশে নারী-পুরুষে ভেদাভেদ বা বৈষম্য নেই, এ কথা দেশের সংবিধানেও বিধৃত (২৮ এর ১ ধারা)। সংবিধানে আরো বলা হয়েছে, জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে (১০ ধারা)। এই মৌলনীতিসমূহ কার্যকরভাবে বাস্তবে রূপ দিতে সরকারি প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশে নারীর অবস্থানে বিভিন্নভাবে অনেক অগ্রগতি হয়েছে : যেমন নারীর শিক্ষায়, স্বাস্থ্যসেবায়, কর্মে, ক্ষমতায়নে। ২০১৪ সাল থেকে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মূল্যায়নে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর ক্ষমতায়নে এবং নারী-পুরুষ বৈষম্য হ্রাসে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। অবশ্য সার্বিক বিবেচনায় যথাযথ পর্যায়ে পৌঁছাতে পথ এখনো অনেক বাকি। যা-ই হোক, এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেছে এবং ঘটছে তা অবশ্যই দৃশ্যমান।

তবে বাঙালি, বিশেষ করে বাঙালি পুরুষের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সাম্যের ধারণাটি কি যথাযথভাবে সবার মনোজগতে প্রোথিত হয়েছে? অবশ্যই অনেক পুরুষ নিশ্চয়ই এই পরীক্ষায় উতরে যাবেন। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতা বিবেচনায় আমার কাছে প্রতীয়মান হয় যে, এখনো ব্যাপকভাবে পুরুষতান্ত্রিকতা বাঙালি পুরুষমানসে স্থিত, এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে  বাঙালি নারীমানসেও নারীর অবস্থান অধস্তনের এরকম ধারণা বিরাজমান রয়েছে।

একটি উচ্চ মনোযোগ আকর্ষণকারী সাম্প্রতিক উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। বিগত ২০ জানুয়ারি (২০২৪) ক্যাপ্টেন তানিয়া রেজা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বোয়িং ড্রিমলাইনার ‘অচিন পাখি’র একটি উড়ানের (যা ঢাকা থেকে সৌদি আরবের দাম্মাম যাচ্ছিল) দায়িত্বে ছিলেন। উড্ডয়নের ঘণ্টাখানেক পর তিনি লক্ষ করেন ককপিটের কাচে (উইন্ডশিল্ডে) ফাটল দেখা দিয়েছে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন ঢাকা ফিরে আসার এবং অত্যন্ত দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার সঙ্গে তা সম্পন্ন করেন। কোনো যাত্রী বা ক্রু হতাহত হননি। তার প্রতি রইল আমার আকাশছোঁয়া অভিনন্দন ও অনিঃশেষ শুভেচ্ছা। কো-পাইলট ও অন্য সব ক্রু-সদস্যকে ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানাই এই কর্মযজ্ঞে যার যার অবস্থান থেকে অবদান রাখার জন্য।

বিভিন্ন সংবাদ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই খবর সংগত কারণে ফলাও করে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে লেখা হয়েছে দেখা গেল যে, চিত্রনায়ক ফেরদৌস/সংসদ সদস্য ফেরদৌসের স্ত্রী ঐ অসাধারণ কাজটি করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্যাপ্টেন তানিয়া রেজার নামই উল্লেখ করা হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার নাম উল্লেখ করা হলেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, তিনি চিত্রনায়ক, সংসদ সদস্য ফেরদৌসের স্ত্রী।

বিমান চালাচ্ছিলেন ক্যাপ্টেন তানিয়া রেজা এবং ২৯৭ জন যাত্রী ও ক্রুকে নিরাপদে ঢাকা ফিরিয়ে আনার কৃতিত্ব তারই, উড়ানটির ক্যাপ্টেন হিসেবে। তিনি একজন ব্যক্তি, অবশ্যই নারী এবং এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তিনি বিমানচালক, ক্যাপ্টেন। আর তিনি যা করেছেন তা সেই পরিচয়ে, কারো স্ত্রী হিসেবে নয়। যারা ক্যাপ্টেন তানিয়া রেজাকে প্রধানত একজনের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে খবর পরিবেশন করলেন বা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখলেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার নারীও। ক্যাপ্টেন তানিয়া রেজা যে তার নিজের পরিচয়ে এবং দায়িত্বে কাজটি করেছেন সেটাই যে খবর, তা তারা অনুধাবন করলেন না। এ থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে এখনো বিদ্যমান। সুস্থ সমাজ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সমাজ, সংবিধানে তাগিদপ্রাপ্ত সাম্যভিত্তিক সমাজ, সর্বোপরি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই সমমানুষ সেই ভিত্তিতে সমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বঙালির, বিশেষ করে বাঙালি পুরুষের মনোজগত্ পুরুষতান্ত্রিকতার জনজালে এখনো ব্যাপকভাবে আক্রান্ত। নারী-পুরুষ সাম্যের পক্ষে এই মনোজগতের শুদ্ধি একান্তভাবে জরুরি।

২. বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা হচ্ছে স্বাধীনতা পুরস্কার। আমার জানামতে, বাংলাদেশের দুজন স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রথিতযশা ব্যক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার বেশ কয়েক বছর পর ভারতের চতুর্থ পর্যায়ের পদ্মশ্রী সম্মাননা পেয়েছেন। খবরটি গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়েছে। অবশ্য অন্য দেশ থেকে এমন সম্মাননা প্রাপ্তির জন্য তাদেরকে অভিনন্দন জানাই। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।

ভারতে পদ্মশ্রীর ওপরে তৃতীয়, দ্বিতীয় এবং সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা যথাক্রমে পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ ও ভারতরত্ন। ভারতরত্নপ্রাপ্তরা রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীদের সমপর্যায়ে। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পর্যায়ের সম্মাননা রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমে সম্ভবত নেই। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি, বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে তাদেরকে সম্মান সহকারে গ্রহণ করা হয়।

বাংলাদেশে স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্তরা রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমে অন্তর্ভুক্ত নন। এছাড়া এই সম্মাননা যারা পেয়েছেন, তারা তা পেয়েছেন সেই কারণে তাদের প্রতি সম্মানসূচক কোনো আচরণ করা হয় বলে আমার জানা নেই। বঙ্গভবন থেকে বিশেষ বিশেষ দিনে (যেমন স্বাধীনতা দিবস, নববর্ষ ইত্যাদি) পাঠানো শুভেচ্ছা কার্ডের খামের ওপর ‘স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত’ লেখা থাকে। এছাড়া আর কোনো সম্মান ‘স্বাধীনতা পুরস্কার নামক সম্মাননার প্রতি প্রদর্শন করা হয় বলে আমার জানা নেই। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমে তারাই অধিষ্ঠিত, যারা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এবং প্রশাসনিক (বেসামরিক বা সামরিক) ব্যবস্থায় বিভিন্ন পর্যায়ের ক্ষমতার চেয়ারে আসীন।

কাজেই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার এবং ভিনদেশের চতুর্থ পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় সম্মাননার তাত্পর্যের দিক থেকে কোনো তফাত কি আসলে আছে? স্বাধীনতা পুরস্কার নামক ‘সম্মাননা’র মর্যাদাই-বা কী রয়েছে?

৩. অত্যন্ত মনঃপীড়ার সঙ্গে লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতায় বসার জন্য কোনো কোনো রাজনৈতিক দল বা দলের কেনো কোনো নেতা অন্য রাষ্ট্রের বা বিদেশিদের সহায়তা চান, হস্তক্ষেপ চান। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন চান কেউ কেউ। কিন্তু এই দেশ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দখলদারমুক্ত করা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। এখানে জনগণই সব ক্ষমতার অধিকারী, তারা এই প্রজাতন্ত্রের মালিক (সংবিধানের ৭-এর ১ ধারা)। কাজেই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া বা থাকার জন্য জনগণের রায় নিতে হবে, কোনো ভিন্ন রাষ্ট্র বা বিদেশিদের হস্তক্ষেপ নয়। বাংলাদেশে সরকারের বাইরে অর্থাত্ বিরোধী অবস্থানে যারা থাকেন, তারা বলেন এবং বাস্তবে সেরকম ঘটে যে, বিদ্যমান সরকার নানা কারসাজির মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার ব্যবস্থা করে। কাজেই ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রেও জনকল্যাণে নিবেদিত নিজেদের কর্মসূচি জনগণের কাছে তুলে ধরে তাদের কাছে, সময় লাগলেও পৌঁছানো সম্ভব, যদি ঐ কর্মসূচি প্রকৃতপক্ষে জনকল্যাণে হয় এবং জননগণের কাছে সেভাবে তা পৌঁছানো যায় এবং গ্রহণযোগ্য হয়। সময় লাগলেও বিভিন্ন দেশে এভাবে পরিবর্তন এসেছে। দূরে না গিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ দেওয়া যায়। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বামরা ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূল কংগ্রেস জনগণের রায় পায় ক্ষমতায় বসার।

অন্য পথ হচ্ছে নাগরিকদের জানমালের ক্ষতি না করে নিজেদের আন্দোলনের মাধ্যমে বিদ্যমান সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পথ সৃষ্টি করা। অতীতে যেমন হয়েছে, ক্ষমতাসীনরা নিপীড়ন চালাতে পারে। কিন্তু জনগণকে সঙ্গে পেলে তা অতিক্রম করা সম্ভব—বাংলাদেশের সেরকমটি দুই বার সফলভাবে ঘটেছে :একবার ১৯৯১-এ জেনারেল এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং ১৯৯৬-এ বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আন্দোলন। তবে দেশের সার্বভৌমত্বকে হেয় প্রতিপন্ন করে ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য বিদেশিদের দ্বারস্থ হওয়া যাবে না। যদি কেউ সেই পথ অনুসরণ করেন, তাহলে তার মনোজগতে পরাধীনতার প্রলেপ দানা বেঁধে রয়েছে বলে ধরে নিতে হবে, স্বধীনতার-সার্বভৌমত্বের সূর্যরশ্মি সেখানে পৌঁছেনি।

আমাদের সবার, বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের চিন্তাচেতনায়, মনোজগতে আমাদের অতি কষ্টার্জিত রক্তস্নাত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের মর্যাদার বিষয়টি পাকাপোক্তভাবে প্রোথিত থাকা জরুরি। অবশ্যই সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার (জনগণের সবার ন্যায্য অন্তর্ভুক্তি সাপেক্ষে সাম্যভিত্তিক, সমুন্নত বাঙালি সংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ন্যায়বিচারের সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তোলা) বশবর্তী হতে হবে।

n লেখক :বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও মানবকেন্দ্রিক সমাজচিন্তক

সূত্র: ইত্তেফাক

সর্বশেষ

জনপ্রিয়