রোববার   ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ || ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

প্রকাশিত: ১৪:৫০, ২৬ নভেম্বর ২০২৩

’নব্বইয়ের পর ছাত্র সংগঠন লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকায় চলে গেছে’

’নব্বইয়ের পর ছাত্র সংগঠন লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকায় চলে গেছে’
সংগৃহীত

ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব। তার নেতৃত্বে ৯০-এ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। হাবিব নামটি বললেই এখনও মানুষের মনে পড়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অগ্রসৈনিক নব্বইয়ের সেই তুখোড় ছাত্রনেতার কথা। তার নেতৃত্ব, সাহস ও দক্ষতার কারণে অনেকে মনে করেছিলেন হাবিব পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন। কিন্ত ঘটেছে তার উল্টোটা। রাগ-অভিমানে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ছেড়ে তিনি যোগ দেন বিএনপির রাজনীতিতে। ১৯৯১ থেকে ৯৬ পর্যন্ত যে বিএনপির বিরুদ্ধে তিনি স্লোগান তুলেছিলেন-আন্দোলন করেছিলেন সেই বিএনপিই হয়ে ওঠে তার ঠিকানা।

তবে বিএনপির রাজনীতিতে তিনি বেশিরভাগ সময় থেকেছেন কোণঠাঁসা হয়ে। বিএনপিতে তিনি কতটা মূল্যায়ন পেয়েছেন তা নিয়ে প্রশ্ন আছে; নাকি কিছুটা সন্দেহের চোখেই তাকে দেখে আসছে দলটি।

রাজনৈতিক জীবনের নানা পট পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসায় বসে হাবিবুর রহমান হাবিবের সঙ্গে কথা হয় । সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল্লাহ আল তোফায়েল।

আপনাদের সময়ের সেই ছাত্র রাজনীতি আর এখনকার ছাত্র রাজনীতির মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখেন কি?

হাবিবুর রহমান হাবিব: আমাদের সময়ের সঙ্গে বর্তমান ছাত্র রাজনীতির ফারাকটা বিশাল। আমরা রাজনীতি করেছি দেশের স্বার্থে, আর এখনকার সময়ের ছাত্র রাজনীতি হচ্ছে পুরোটাই দলীয় প্রয়োজনে। আমরা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করেছি, শহীদ জেহাদের লাশ কাঁধে নিয়ে ক্যাম্পাসের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে মিছিল করেছি। দলের কথা চিন্তা না করে সাধারণ ছাত্রদের জন্য কথা বলেছি। এখনকার ছাত্র নেতারা দলীয় আদর্শের চেয়ে অর্থ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জনে মনযোগী। ফলে তাদের আদর্শিক চেতনাবোধ কতটা গড়ে উঠেছে এটা কিন্ত একটা বড় প্রশ্ন।

ওই সময়ে ছাত্র রাজনীতি কেমন ছিল, ছাত্র নেতাদের জীবনযাপনই বা কেমন ছিল?

হাবিবুর রহমান হাবিব: আমরা যারা ছাত্রনেতা ছিলাম তাদের দিন শুরু হতো খুব সকালে। ঘুম থেকে উঠে আমরা কর্মসূচী নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতাম। এমন অনেক দিন গেছে, সকালের নাস্তা কিংবা দুপুরের খাবার খাওয়ার টাকা ছিল না। ওই সময় কোনো ছাত্রনেতার গাড়ি থাকবে এটা কল্পনাও করা যেত না। আমরা জেলা ও বিভাগীয় সফরে পাবলিক বাসে করে যেতাম। খুব সাধারণ হোটেলে এমনকি স্থানীয় নেতাকর্মীদের বাসায়ও থাকতাম।

আর এখন তো ছাত্রলীগ নেতারা হেলিকপ্টারে সফর করেন। ঢাকায় বিলাসবহুল বাসায় থাকেন। তাদের টাকাপয়সার অভাব নেই। এমনও দেখেছি, ছাত্রনেতাদের মায়ের জন্মদিন পর্যন্ত কর্মীরা পালন করছে। অথচ, আমাদের তো নিজেদেরই জন্মদিন পালন হতো না। এটা যে কেবল ছাত্রলীগের ক্ষেত্রে তা নয়, বিএনপি ক্ষমতায় আসলে ছাত্রদলেরও একই অবস্থা হবে।

ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের অগ্রনায়ক ছিলেন, কেমন ছিল সেই দিনগুলো?

হাবিবুর রহমান হাবিব: স্বাধীন বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল এরশাদবিরোধী আন্দোলন। ওই আন্দোলনের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে আর কোনো আন্দোলনের তুলনা চলে না। আমি গর্বিত যে মূলত আমার পরিকল্পনাতে এরশাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। ওই সময় সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠন করি, এরপরই আন্দোলন গতি পায়। তখন সব রাজনৈতিক দল যৌথভাবে কর্মসূচি দিত। ওই আন্দোলনের হাতিয়ার ছিল হরতাল, অবরোধ, ঘেরাও। আমরা টানা ৭২ ঘণ্টা, ৯৬ ঘণ্টা, ১২০ ঘণ্টা হরতাল করেছি, সচিবালয় ঘেরাও করেছি। পুলিশ তখনো হামলা করেছে। পুলিশের গুলিতে অনেকে নিহত হয়েছেন। কিন্তু এখনকার মতো এত মামলা হয়নি।

এরশাদ পতনের আন্দোলনে ছাত্র নেতারা স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে মিছিল করেছেন। স্যান্ডেল পড়ে আন্দোলন-মিছিল পুলিশের সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব হচ্ছিল না, ফলে আমি জিন্স ও কেডস পড়া শুরু করি। তখন জিন্স ও কেডস পড়া কিন্ত অনেক বড় বিষয় ছিল।

ছাত্র নেতারা এখন বিত্তশালী, ছাত্র নেতাদের টাকা উপার্জন করতে হবে এমন চিন্তা কীভাবে আসল, এর দায়ই বা কার?

হাবিবুর রহমান হাবিব: ছাত্র রাজনীতি নব্বইয়ের পর থেকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে শুরু করে। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে ছাত্র সংগঠনে মূল দলের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকে এবং দলের লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকায় চলে যায় তারা। ৯১-এ বিএনপি সরকার, ৯৬-এ আওয়ামী লীগ সরকার ছাত্রদের ব্যবহার করেছে দলীয় স্বার্থে; যার ধারাবাহিকতা চলছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তো আর ছাত্র রাজনীতি নেই। তারা নির্বাচনের পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতিকেও নির্বাসনে পাঠিয়েছে। এখন ক্যাম্পাসে সরকারি দলের বাইরে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির তো নেই-ই বাম ছাত্র সংগঠনকে খুঁজে পাওয়া যায় না। আমাদের সময় লক্ষ্য ছিল এরশাদের পতন, গণতন্ত্র অর্জন। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে ছাত্র নেতাদের লক্ষ্য ছিল দেশ স্বাধীন করা। এখন ছাত্র রাজনীতির লক্ষ্য নেই, তাই অপকর্ম চলছে।

আপনি ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। সংগঠন চালানোর জন্য তো একটা খরচ ছিল, তার জোগান কীভাবে হত?

হাবিবুর রহমান হাবিব: আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর থেকে দল চালানোর জন্য যখন যে খরচ লাগতো তা দিতেন। ১৯৮৬ সালে যখন ছাত্রলীগের সুলতান মনসুর সভাপতি আব্দুর রহমান সেক্রেটারি, আমি তখন সহসভাপতি। সে সময় অনেকবার শেখ হাসিনা আমার হাতে টাকা দিয়েছেন, আমি সভাপতি-সেক্রেটারিকে তা দিতাম। এরপর তো আমিই সভাপতি হলাম। ফলে আমরা কোনদিন চাঁদার জন্য কারও কাছে যাইনি। আমার মনে হয়, অন্যান্য ছাত্র সংগঠনও এভাবেই চলতো।

আওয়ামী লীগ ৩ মেয়াদে ক্ষমতায়। এটা দেখে আফসোস হয় না? যদি দলে থাকতেন তাহলে ক্ষমতার অংশীদার হতে পারতেন?

হাবিবুর রহমান হাবিব: আওয়ামী লীগ এখন আদর্শিক রাজনীতি করে না। তাদের আমলে কতগুলো ব্যাংক লুট হয়ে গেছে। তাদের মাথার ওপরে দরবেশ, বাচ্চু, এস আলম, ইয়াবা বদী, ক্যাসিনো কাণ্ডের হুতারা ঘুরপাক খাচ্ছে। ফলে আফসোস লাগে না। আওয়ামী লীগ যদি আদর্শিক রাজনীতি করতো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সত্যিকার অর্থে লালন করতো তাহলে হয়তো আফসোস হতো। এখন বরং আওয়ামী লীগ না করায় স্বস্তি পাই। দেখুন, আওয়ামী লীগের মতো একটা দল দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এই যে এত এত অনিয়ম নিশ্চিতভাবে জেনে রাখুন একটা প্রজন্ম কিন্ত আওয়ামী লীগের কাছে দায়ভার দেবে তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে জানতে চাইবে।

এই সময়ে আপনি আওয়ামী লীগে থাকলে কি দলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন? তাহলে বর্তমান নেতারা কেন প্রতিবাদ করতে পারেন না?

হাবিবুর রহমান হাবিব: নিশ্চিত ক্ষমতায় যেতে থাকা একটা দল ছেড়ে আমি ক্ষমতা হারাতে যাওয়া দলে যোগ দিয়েছি। মন্ত্রী হওয়ার মোহ উপেক্ষা করে রাজপথে আন্দোলন করে গেছি। এগুলো আদর্শিক কারণে। এখন প্রতিবাদ করতাম কি না এই প্রশ্নের জবাব একটু অন্যভাবে দিই। যখন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা হলো তখন তো আমি বিএনপির রাজনীতি করি, দল ক্ষমতায়। সে সময়ের পত্রপত্রিকা দেখলে প্রমাণ পাবেন যে আমি এর বিরুদ্ধে কথা বলেছি। আমি বলেছি জজ মিয়া নাটক সাজানো ঠিক হয়নি। সঠিক তদন্ত করা উচিত। বর্তমানে আওয়ামী লীগে থেকে যাদের প্রতিবাদ করার কথা তারা বিভিন্ন সময় অপকর্ম করেছেন, প্রতিবাদ করতে গেলে নৈতিক ভিত্তি লাগে। অপরদিকে আওয়ামী লীগে এখন গণতান্ত্রিক চর্চা নেই। ফলে আপনি কীভাবে প্রতিবাদ করবেন?

আপনি আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিলেও যথাযথ মূল্যায়ন পাননি। এমন কি নমিনেশন পেতেও যুদ্ধ করতে হয় এ নিয়ে আফসোস আছে কি?

হাবিবুর রহমান হাবিব: রাজনীতিতে আমার আফসোস নেই। খালেদা জিয়া আমাকে অসম্ভব স্নেহ করেন সম্ভবত আপনারা জানেন। একটা ঘটনা বলি, আমি তখন ভীষণ অসুস্থ। জরুরি প্রয়োজনে ডাক্তাররা বললেন দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য নিয়ে না গেলে আমাকে বাঁচানো যাবে না। আমার তো টাকা নেই, তাই যাওয়া সম্ভব ছিল না। আমার অসুস্থতার খবর শুনে খালেদা জিয়া আমার পরিবারকে বললেন বিদেশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে। প্রায় এক কোটি টাকা খরচ হলো, যার এক টাকাও আমার নয়। এরপর যখন দেশে ফিরে আসলাম তখন ম্যাডাম দুই থেকে তিন মাসের খরচ চালানোর টাকা আমার হাতে তুলে দেন। আরেকটা কথা তারেক রহমান আমাকে পছন্দ করেন। নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন, আমার পরামর্শ শুনেন, আমাকে পরামর্শ দেন। ফলে দীর্ঘদিন পর সব বিভেদ ভুলে পাবনা জেলা বিএনিপিকে এক সুতায় নিয়ে আসছি।

তবে খারাপ লাগে। এই যে আমার চেয়ে জুনিয়র ছেলেরা আজ বিএনপিতে লিড দিচ্ছে। যাদের যোগ্যতা নেই তারা স্টেজে জায়গা পাচ্ছে, আমাকে এসব অপমান সহ্য করেও নিয়মিত আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিতে হচ্ছে। এসব আমাকে কষ্ট দেয়। আজ পর্যন্ত আমি এমপি হতে পারিনি। তবে দিনশেষে আমি ভালো আছি। এমপি হওয়া না হওয়াতে আমার কিছু যায় আসে না।

 আপনার নিজের গাড়ি-বাড়ি নেই কেন? তদবির করে সুবিধা করতে পারেননি নাকি অন্য কোনো কারণ?

হাবিবুর রহমান হাবিব: আমার ব্যক্তিগত কোন গাড়ি নেই, আমি প্রতিদিন গণপরিবহনে যাতায়াত করি। আপনি যে বাসায় আসলেন দেখেছেন নিশ্চয় আমার এখানে লিফট নেই। আমি বছরের পর বছর এই ভাড়া বাসায় থাকি। নিজের বাড়ি গাড়ি নেই। এ নিয়ে আফসোস নেই। দেখেন আওয়ামী লীগ দেশ চালাচ্ছে। ওই দলে আমার বন্ধু শুভাকাঙ্ক্ষীর অভাব নেই। যেকোনো মন্ত্রণালয়ে কিছু টেন্ডার চাইলেই ওরা খুশি হয়ে দেবে, আর আমার বাড়ি গাড়ি হয়ে যাবে, আমি তা জানি। কিন্ত ওই যে মোহ নেই আমার। আরেকটা কথা, ২০০১ এ খালেদা জিয়া যখন সরকার গঠন করলেন, আঞ্চলিক স্বড়যন্ত্র আর জোটের বেড়াজালে আমাকে নমিনেশন দেওয়া হয়নি। সরকার গঠনের পর ম্যাডাম  বলে দিলেন, হাবীবের জন্য সব মন্ত্রণালয়ের দরজা খোলা। ও যখন যা চাইবে কেউ না বলবেন না। খোঁজ নিয়ে দেখুন আমি কখনো কোনো সুবিধা নিইনি।

সূত্র: দেশ রূপান্তর

সর্বশেষ

জনপ্রিয়