বৃহস্পতিবার   ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ || ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০

প্রকাশিত: ১২:২৪, ২৭ নভেম্বর ২০২৩

রেখা’র জীবনরেখা: বিয়ে, সমপ্রেম, আড়াল ও অকথ্য গল্প

রেখা’র জীবনরেখা: বিয়ে, সমপ্রেম, আড়াল ও অকথ্য গল্প
সংগৃহীত

ভারতীয় চলচ্চিত্রে রেখা যেন এক মিথ। যার জীবন-রহস্য নিয়ে নেই কৌতূহলের সীমারেখা। রেখা নাম হলেও তার জীবন মোটেও সরলরৈখিক নয়। বারবার তার নাম জুড়েছে বিতর্কে। তার অভিনয় দক্ষতা থেকে সৌন্দর্য আজও পুরুষের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। সত্তরের দশকের সুপারহিট অভিনেত্রী রেখা আজও তাই এভারগ্রিন। যে কোনো অনুষ্ঠান কিংবা ছবির মহরত; যেখানেই তিনি পা দেন, মুহূর্তে সবটুকু ‘লাইট’ শুষে নেয়ার ক্ষমতা রাখেন অভিনেত্রী রেখা।

ছোটবেলাতেই পর্দায় প্রথম উপস্থিতি তার। পরে মাত্র ১৫ বছর বয়সে একজন পূর্ণ অভিনেত্রী হয়ে ওঠেন। সেই সাক্ষাৎকারে রেখা বলেছিলেন, ‘আমি কখনই অভিনেত্রী হতে চাইনি। আপনি যদি বেশিরভাগ তারকাকে জিজ্ঞাসা করেন- তারা বলবে, তাদের স্বপ্নই ছিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে যোগ দেওয়া, কিন্তু আমার নয়। আমি কখনই অভিনেত্রী হতে চাইনি, আমাকে জোর করে অভিনেত্রী বানানো হয়।’

চলচ্চিত্র জগতে তার প্রবেশ সহজ ছিল না। লেখক ও সাংবাদিক ইয়াসির উসমান ২০১৬ সালে রেখার জীবনী ‘রেখা দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ লিখেছিলেন। যেখানে তার জীবন, কর্মজীবন এবং ব্যক্তিগত জীবনের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়।

বিয়ের সুখ না মা পেল, না মেয়ে পেল

রেখা বলতেন ‘বিয়ের ব্যাপারে আমার আর আমার মায়ের ভাগ্যলিখন এক’। রেখা ছিলেন লাভ চাইল্ড। কন্যার পিতৃপরিচয় বিখ্যাত স্টার অভিনেতা বাবা স্বীকার করেননি। জন্মের শুরু থেকেই তার লড়াই শুরু। রেখা তেলেগু অভিনেত্রী পুষ্পাবল্লি ও তামিল অভিনেতা জেমিনি গণেশনের মেয়ে ৷ কিন্তু রেখার বাবা-মায়ের বিয়ে হয়নি, কারণ জেমিনি আগেই বিবাহিত ছিলেন। নটী পুষ্পাবল্লি রয়ে গেলেন দুসরী আউরত হয়ে। জেমিনি পরে অভিনেত্রী সাবিত্রীকে বিয়ে করে স্ত্রীর সম্মান দিয়েছিলেন। কিন্তু পুষ্পাবল্লি রক্ষিতার পরিচয়ে রয়ে যান।

পিতৃপরিচয় ধরে রেখার আসল নাম ভানুরেখা গণেশন। কিন্তু শৈশবেই রেখাকে নিজের সন্তান হিসাবে মানতেন না জেমিনি৷ মা-মেয়ের লড়াই শুরু হল ছোট থেকেই। স্কুলের পঠনপাঠন ছেড়ে রেখাকে নাবালিকা বয়সেই দক্ষিণী ছবিতে নেমে পড়তে হয় শিশুশিল্পী রূপে।

শুরুতেই শ্লীলতাহানির শিকার

শ্লীলতাহানি কী জিনিস বুঝে গেল ১৫ বছরের ভানুরেখা। না, সেদিন কোনো প্রতিবাদই করতে পারেনি সে, কারণ সেটি তার নায়িকা রূপে ক্যারিয়ারের শুরুর ছবি এবং যেই নায়ক সেই ভক্ষক রূপে যদি থাকেন মধ্যগগনে থাকা স্টার বিশ্বজিৎ। সালটা ১৯৬৯, মেহবুব স্টুডিওতে চলছিল ‘আনজানা সফর’ ছবির শ্যুটিং। রেখার জীবনী বইতে লেখা হয়েছে পরিচালক রাজা নাওয়াত ও বিশ্বজিতের কুপরিকল্পনায় ঘটে রেখার যৌন হেনস্থার ঘটনাটি। ছবির রোম্যান্টিক দৃশ্যে শুধু দুজনের মুখের আড়ালে চুম্বন দৃশ্য বোঝানো হবে এমনটাই কথা ছিল। অথচ পরিচালক অ্যাকশন বলার সঙ্গে সঙ্গে ১৫ বছরের রেখার ঠোঁট সপাটে নিজের মুখের মধ্যে নিয়ে নেন ৩০ বছরের বিশ্বজিৎ। চিত্রনাট্য অনুযায়ী রেখার চোখ ছিল বিশ্বজিতের চোখের দিকে, কিন্তু সেই চোখ ভরা ছিল জলে।

পাঁচ মিনিট পেরিয়ে গেলেও পরিচালক কাট বলেননি এবং বিশ্বজিৎ স্মুচ করেই চলেছেন নাবালিকা রেখাকে, যা দেখে ফ্লোরের সব টেকনিশিয়ানরা বাজালো সিটি-হাততালি! ‘সেক্স-কিটেন’ তকমা বসে গেল তার গায়ে।

‘আনজানা সফর’ সিনেমায় এই দৃশ্যটি নিয়ে আপত্তি তুলেছিল সেন্সর বোর্ড। ফলে সিনেমাটির মুক্তি ১০ বছর পিছিয়ে যায়। তারপর ঐ চুম্বন দৃশ্যের অনেকটা বাদ দিয়ে ১৯৭৯ সালে ‘দো শিকারি’ নামে ছবিটি মুক্তি পায়। যদিও একাংশের মত বিশ্বজিৎ-রেখার অসমবয়সি প্রেম ছিল। রেখা ক্যারিয়ারে উঠতে বিশ্বজিৎকে তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে সুযোগ দেন।

বিনোদ মেহরার মা রেখাকে পেটালেন পায়ের চটি দিয়ে

রেখা বিনোদ মেহরার সঙ্গে তার বিয়ে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ‘ঘর’ ছবির জুটি যে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিল তা মিথ্যা নয়। বিনোদ মেহরা মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছরের জীবনে চারবার বিবাহ করেন। কিন্তু যখন বিনোদ রেখাকে নিয়ে মুম্বাইয়ে তার বাড়িতে যান, তখন বাড়ির দোরগোড়াতে নববধূকে বরণ করার পরিবর্তে জুতাপেটা করেন বিনোদের মা কমলা মেহরা। বিনোদ মায়ের আক্রোশ থেকে রেখাকে বাঁচিয়ে রেখার বাড়িতে রেখে আসেন। সে একরাতের বিয়েও ভেঙে যায় রেখা-বিনোদের। বিনোদ আবার বিবাহ করেন এবং সন্তানসন্ততিও হয়। রেখা রয়ে যান শাপভ্রষ্টা অপবাদের দুসরী আউরত হয়ে।

বলিউডের ‘নারীকেন্দ্রিক’ চরিত্রে অভিনয়

১৯৭০-এর দশকে তিনি যে ১০০ সিনেমা করেছিলেন তা হয়তো অনেকের মনে নেই, কারণ তার সেসব সিনেমা খুব কম সফল হয়েছিল। তখন তিনি ‘বি’ গ্রেডের চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন। তবে ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি তারকা স্ট্যাটাসে পৌঁছেছিলেন। তিনি এ ধরনের স্টারডমে পৌঁছানোর জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন এবং প্রযোজক এবং পরিচালকরা তার খ্যাতির জন্য তাকে নিতে বাধ্য হন।

রেখা সম্ভবত বলিউডের প্রথম অভিনেত্রী যিনি ‘নারীকেন্দ্রিক’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি ১৯৬৯ সালে ক্যারিয়ার শুরু করেন এবং ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে বড় তারকা হয়ে উঠেছিলেন, তাই এটি তার প্রায় ১০ বছরের লড়াই ছিল।

রেখা সিঁদুরে সীমন্তিনী কার নামে?

১৯৮০ সালের ২২ জানুয়ারি ঋষি-নীতু কাপুরের বিবাহ-বাসরে হঠাৎই সিঁথি ভরা সিঁদুর আর মঙ্গলসূত্র পরে চলে আসেন রেখা। রেখা হলেন নীতু সিং কাপুরের অভিন্ন-হৃদয় বান্ধবী। যে বন্ধুত্ব তাদের আজও অটুট। সেই বাসরে নীতু-ঋষিই ছিলেন প্রধান আকর্ষণ, কিন্তু রেখা সিঁদুররাঙা হয়ে যেতে হঠাৎই প্রেস ক্যামেরা ঘুরে যায় তার দিকে। এমনকি সেদিন অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন অমিতাভ বচ্চন এবং জয়া বচ্চন। রেখা সিঁদুর পরেই এগিয়ে যান অমিতাভের দিকে এবং তার সঙ্গে কথা বলতে থাকেন অবিচলভাবে প্রেসের সামনে।

জয়া সেদিন বিড়ম্বনায় পড়েন। মাথা নীচু করে চোখের জল ফেলেন জয়া। অথচ অমিতাভের আগেই জয়াকেই চিনতেন রেখা। ‘দো আনজানে’ ছবি ছিল রেখা-অমিতাভ জুটির প্রথম ছবি। যে ছবির সেটে রেখা প্রেস মিটে বলেছিলেন ‘জয়া দিদির বয়ফ্রেন্ড, পরে বর হিসেবেই অমিতাভকে চিনতাম। এই ছবি করতে এসে পরিচয় হল আরও।’

একদিন অমিতাভ যখন মুম্বাইয়ের বাইরে জয়া রেখাকে ডেকে পাঠান তার বাংলোয় ডিনারের নিমন্ত্রণ জানিয়ে। রেখা বেশ ভয় পেয়ে যান! তবে সেদিন জয়া খুব ভালো ব্যবহার করে তার সংসারের হালচাল ভালো মতো বুঝিয়ে দেন রেখাকে। তাদের মধ্যে শুধু অমিতাভকে নিয়েই কথা হয়নি সেদিন। ‘সিলসিলা’ ছবি ছিল জয়ার বিয়ের পর কামব্যাক ছবি এবং অমিতাভ-রেখা জুটির শেষ ছবি। পরকীয়ার ছবি ফ্লপ করে অথচ যশ চোপড়া চিত্রিত করেছিলেন ত্রয়ীর ত্রিকোণ প্রেম, যা আজও আলোচিত রহস্য-ঘনীভূত।

রেখার স্বামী করলেন আত্মহত্যা, কেন?

শেষ অবধি রেখা তার ভালোবাসা খুঁজে পান, দিল্লীর শিল্পপতি মুকেশ আগারওয়ালের মধ্যে। মুকেশ রেখার এক ঘনিষ্ঠজনের কাছে রেখার ফোন-নম্বর চেয়ে বলেছিলেন রেখার প্রতি তার ভালোবাসার কথা। রেখা সব শুনে ভাবেন এবার হয়তো সঠিক ভালোবাসা এল তার জীবনে। ১৯৯০ সালে বিয়ে হয় মুকেশ-রেখার।

রেখা আবিষ্কার করেন মুকেশ অত্যন্ত পজেসিভ এবং ফিল্ম ছেড়ে দিতেও বলেন। মুকেশের অবসাদ কাটাতে মনোবিদও দেখান রেখা। কিছুই লাভের লাভ হয় না। বিয়ের সাত মাস যেতে না যেতেই মুকেশ ফিল্মি স্টাইলে রেখার দোপাট্টা দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে পড়েন সিলিং ফ্যানে। রেখা তখন বিদেশে। মুকেশের আত্মহত্যা ভারতবর্ষে রেখাকে ডাইনি বানিয়ে দেয়।

মুকেশ আগরওয়ালের মৃত্যুর পরও রেখা সিঁদুর পরেন আজও। অপ্সরাদের সধবা বিধবা বৃত্তে পরিচয় হয় না।

সমকামী রেখা!

মুকেশ আগারওয়ালের আত্মহত্যার কারণ নাকি ছিল রেখা ও তার লেডি সেক্রেটারির অবৈধ যৌন সম্পর্ক! এমনই খবরে ছয়লাপ হয়ে গিয়েছিল বলি ইন্ডাস্ট্রি। পরবর্তীকালে রেখার এক জীবনীকার রেখা জীবনী গ্রন্থে তুলে ধরেন রেখার রহস্যাবৃত যৌনজীবনের গোপন গল্প। রেখার সেক্রেটারি ছায়াসঙ্গী ফারজানা নারী হলেও তার দেহসৌষ্ঠব, সাফারি পোশাক, ব্যবহার সবকিছুই পুরুষের মতো। রেখার রহস্যে ঘেরা জীবনের চাবিকাঠি আছে একমাত্র ফারজানার হাতেই। রেখার শয্যাকক্ষে প্রবেশের অনুমতি একমাত্র তারই। এক অনালোচিত সম্পর্ক তাদের। ফারজানা লেসবিয়ান বারবার উঠে এসেছে শিরোনামে। সঙ্গে সঙ্গে রেখাও লেসবিয়ান নাকি উভকামী তা নিয়েও গুজব কম রটেনি।

সমাজ, মিডিয়া, পাবলিক রটিয়েছে তাদের বন্ধুত্ব আদতে যৌন সঙ্গীর সম্পর্ক। ফারজানার সঙ্গে রেখার যৌন সম্পর্কের কারণেই নাকি মুকেশ আত্মহত্যা করেন। সমাজ তো কাদা ছুড়তে পারলেই বাঁচে। কিন্তু মুকেশের আত্মহত্যার দোষী ও অপবাদে দগ্ধা রেখাকে দু হাত দিয়ে পক্ষীমাতার মতো আগলে রেখেছিলেন ফারজানা। সেই থেকে উনি রেখার ছায়াসঙ্গী দীর্ঘ তিরিশ দশক।

অমিতাভ রেখা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে মুখোমুখি হলেও রেখার পাশে থাকেন ফারজানা। ফারজানা রেখার হেয়ার স্টাইলিশ থেকে সেক্রেটারি পরে চিরবন্ধু হয়ে যান। তাদের সম্পর্কের বোঝাপড়া সমাজ যে নামই দিক, চিরকাল সম্পর্কে আঘাত পাওয়া ভালোবাসার কাঙালিনী রেখা অন্তত ভালো বন্ধু তো একজন পেয়েছেন। সমাজ বা মিডিয়াকে কেয়ার কোনদিনই করেননি রেখা।

‘কামসূত্র’ ছবিতে রেখা

সব বিতর্ক পেরিয়ে আজও রেখা বলিউডের আল্টিমেট স্টার হিরোইন। তিনিই প্রথম মুজরা গার্ল। ডান্সিং ডিভা, যার সব ডান্স নাম্বার হিট। রাজনৈতিক জগতেও তিনি ফ্রন্টপেজ গার্ল। তবু গ্ল্যামার জগতের মোহময় জীবন এড়িয়ে রেখা আজও কঠোর নিয়ম মাফিক নিজের জীবনযাত্রা মেনে চলেন রেখা। তিনি সন্ধ্যা সাতটার আগেই ডিনার সারেন তারপর আর জল ছাড়া কিছু খাননা, আজও কত্থকের তালিম নেন, আজও তিনি নিজেকে সংযমে বেঁধে রেখেছেন।

চিরযৌবনা রেখা, এক সাধনার নাম।

 

সূত্র: ডেইলি-বাংলাদেশ

সর্বশেষ

জনপ্রিয়