শনিবার   ১৫ জুন ২০২৪ || ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

প্রকাশিত: ০৪:৪৭, ১৭ মে ২০২৩

গাইবান্ধার মেয়ে সাকিনার মাঠে অদম্য সাফল্যের ঝিলিক

গাইবান্ধার মেয়ে সাকিনার মাঠে অদম্য সাফল্যের ঝিলিক

দারিদ্র্যপীড়িত জনপদ গাইবান্ধায় বেড়ে ওঠা। মানুষের দুঃখ, জীবনের যাতনা দেখে দেখে কেটেছে শৈশব। খুব কাছ থেকেই অনুভব করেছেন ভাতের কষ্ট। তাই ছেলেবেলাতেই দৃঢ় সংকল্প, গাঁথেন স্বপ্ন– বড় হয়ে এমন কিছু করবেন, যাতে কারও ভাতের অভাব না হয়, গোলার ধান যেন না ফুরায়। অদম্য সাকিনা খানম তা করে দেখালেন। সত্যি সত্যি তাঁর হাত ধরেই এখন মাঠে মাঠে ধানের সুবাস। তিনিই দেশজুড়ে ফেললেন সফলতার আলো।

‘বিনা ধান ২৫’ উদ্ভাবন করে আলোড়ন তুলেছেন কৃষিবিজ্ঞানী ড. সাকিনা খানম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। তাঁকে ‘দেশের আসল নায়ক’ আখ্যা দিয়ে বইছে প্রশংসার জোয়ার। সাকিনার ‘বিনা ধান ২৫’ ঘিরে মাঠে মাঠে নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন। অথচ ধানটি মাঠে নিতে এই নারী বিজ্ঞানীকে মাড়াতে হয়েছে বন্ধুর পথ। কর্মক্ষেত্রেও ছিল নানা বঞ্চনা। তবু তিনি সব বাধা ঠেলেছেন; পেয়েছেন জয়।

বিজয়ের গল্প শুনতে সমকাল থেকে ফোন দিতেই এই কৃষিবিজ্ঞানী বললেন, ‘মাঠে দোল খাওয়া সোনালি শীষ দেখতে দেখতেই এ গল্প শুনতে পারেন।’ গত মঙ্গলবার ড. সাকিনা এ প্রতিবেদককে নিয়ে রওনা দিলেন মাগুরার মহম্মদপুরের ভাতুয়াডাঙ্গা গ্রামে। যেখানে এবারই প্রথম আবাদ হয়েছে ‘বিনা ধান ২৫’। ভরদুপুরে আকাশে তেজি রোদ। গ্রামে ঢুকতেই দূর থেকে চোখে লাগে সোনালি ধানের ঝিলিক। ধানক্ষেতের পাশে যেতেই এগিয়ে এলেন গ্রামের বেশ কয়েকজন কৃষক। সাকিনা তাঁদের কাছে জানতে চাইলেন, ধানের নতুন জাতটি কেমন ফলন দিচ্ছে? কৃষক আব্দুল হাদী নতুন চকচকে ধান দেখিয়ে বলেন, ‘আপনাদের জাত চাষ করে ভালো ধান হইছে। এ
ধানের চাল সবচেয়ে সরু হওয়ায় দামও ভালো পাব।’

বাসমতীর চালের বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ অভিজাত এই ধানের উদ্ভাবক ড. সাকিনা ধানের শীষে হাত বোলাতে বোলাতে জানালেন, নিজেকে কখনোই ‘নারী বিজ্ঞানী’ মনে করেন না, তিনি শুধুই ‘বিজ্ঞানী’। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা ড. সাকিনা বলেন, ‘‘১০ বছর আগে জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা এ ধান নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তাঁদের অনেকেই এখন অবসরে। এরমধ্যে ধানটি ছাড় পাওয়ার জন্য আবেদনও জমা পড়ে। তবে কিছু সমস্যা থাকায় ছাড় পাওয়া যায়নি। পরে ধানটি নিয়ে গবেষণার দায়িত্ব দেওয়া হয় আমাকে। ২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি ‘বিনা ধান ২৫’ জাত অবমুক্ত করা হয়। এই বছরই বোরো মৌসুমে প্রথম সারাদেশে চাষ হয়েছে।’

গাইবান্ধা সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে এসএসসি পাস করেন সাকিনা। এরপর গাইবান্ধা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেনেটিক্স এবং প্লান্ট ব্রিডিং বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেন। পরে জাপানের কোবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আণবিক জেনেটিক্স এবং ফিজিওলজিতে পিএইচডি করেন। তিনি আবুধাবিতে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণায় খেজুরের বৈশিষ্ট্য এবং জেনেটিক বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করেন। সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, কোরিয়াতে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা কর্মে ধানের কৃষিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের সাইটোপ্লাজমিক প্রভাব নিয়েও তাঁর কাজ রয়েছে। ধান নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে সাকিনার দিনরাত কেটেছে গবেষণাগারে। ঘুরেছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। কঠিন এই সময়ে তাঁর পাশে ছিল পরিবার। সাকিনা এক সন্তানের জননী।

বাবাকে স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবার খুব বেশি সচ্ছল ছিল না। তবু কষ্ট করে পড়াশোনা করিয়েছেন। দাদা আর বাবার উৎসাহে এগিয়ে গেছি। বিসিএসে লিখিত পরীক্ষায় পাস করেও সন্তান জন্মের আগে অসুস্থ থাকায় মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারিনি। এরপর ১৯৯৭ সালে যোগ দিই বিনায়।’

নিজের জীবনে বঞ্চনার কথা শোনাতে গিয়ে বলেন, ‘চাকরি শুরুতে বিনাতে ক্রপস বিভাগে ছিলাম। এখানে জাত নিয়ে গবেষণার তেমন সুযোগ নেই। ফলে বার বার চেষ্টা করেছি ব্রিডিং বিভাগে যেতে, যেখান থেকে বিভিন্ন জাত নিয়ে গবেষণা করা যায়। চেয়েছি নিজের মেধা দেশের জন্য বিলিয়ে দিতে, তবে সব যোগ্যতা থাকার পরও আমাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। উল্টো বাধা দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে বিনা ধান ২৫, গম, পাট, মুগডাল ও চিনাবাদাম নিয়ে গবেষণার সুযোগ পেয়েছি। বিনা চিনাবাদাম-১১ ছাড় পেয়েছে। আরও আগে সুযোগ পেলে হয়তো দেশের জন্য অনেক কিছু করতে পারতাম।’

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যত ধানের জাত উদ্ভাবন হয়েছে, এর মধ্যে সবচেয়ে লম্বা ও সরু বিনা ধান ২৫। প্রিমিয়াম কোয়ালিটির চাহিদা দেশে অনেক বেশি এবং এটি বিদেশেও রপ্তানি করা যায়। এই ধান স্বল্পমেয়াদি, জীবনকালও খুবই কম। ব্রি ধান ২৯-এর চেয়ে ১৫ থেকে ২০ দিন আগে পেকে যায়। জাতটি শেখ রাসেলের নামে করার আবেদন করা হলেও তা অনুমোদন পায়নি।

সাকিনা খানম বলেন, চাষের ১৩৮ থেকে ১৪৮ দিনেই এ ধান সংগ্রহ করা যায়। এ ধানের ফলন হেক্টরপ্রতি সাড়ে ৭ টন থেকে সাড়ে ৮ টন। জমিতে পানি জমে থাকা বা বৈরী আবহাওয়ায় প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়ে ধান গাছ সাধারণত সাময়িক হেলে পড়ে। পরে জমি থেকে পানি সরে গেলে এবং রৌদ্রকরোজ্জ্বল অবস্থায় বিনা ধান ২৫ জাতটি ২-৩ দিনের মধ্যে ফের আগের অবস্থায় ফিরে আসে। সেই সঙ্গে স্বাভাবিক ফলন দেয়। এর ধানের ভাত ঝরঝরে ও খেতে সুস্বাদু। আছে সর্বাধিক পুষ্টি।

তিনি আরও বলেন, এ ধানে রোগ ও পোকার আক্রমণ নেই বললেই চলে। চাষে পানিও লাগে কম। ইউরিয়া সারসাশ্রয়ী। এ জন্য বিনা ধান ২৫ ইউরিয়া, পানি ও বালাইনাশক সাশ্রয়ী জাত বলা যায়।
বিনা মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম বলেন, এ পর্যন্ত বিনার বিজ্ঞানীরা ২৬ ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। এর মধ্যে বিনা ধান ২৫ অতি লম্বা ও সবচেয়ে সরু ধানের জাত। এটি বিদেশে রপ্তানিযোগ্য প্রিমিয়াম কোয়ালিটির চাল দেবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ অনুবিভাগের অধিদপ্তরের অতিরিক্ত সচিব রবীন্দ্রশ্রী বড়ুয়া বলেন, নতুন এই জাতের ধান থেকে বীজ সংরক্ষণ করা সম্ভব। সারাদেশে এই জাতের আবাদ করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমে আসবে। বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে। লক্ষ্য পূরণে এবং বিনা-২৫ জাতের এই বীজ ছড়িয়ে দিতে ইতোমধ্যে দেশের ৩৯৬ উপজেলাতে ৫ কেজি করে বীজ আবাদের জন্য সরবরাহ করা হয়েছে।

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘বিনা ধান ২৫ এখন পর্যন্ত দেশের সেরা জাত। ধান উৎপাদনে এই জাত বিপ্লব ঘটাবে। জাতটি আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে আমরা কাজ করছি।’

দৈনিক গাইবান্ধা

সর্বশেষ

সর্বশেষ