বুধবার   ১৯ জুন ২০২৪ || ৬ আষাঢ় ১৪৩১

প্রকাশিত: ০৫:১৫, ২৭ মার্চ ২০২৩

নকশী কাঁথায় স্বাবলম্বী উদয়সাগর গ্রামের ২শ নারী

নকশী কাঁথায় স্বাবলম্বী উদয়সাগর গ্রামের ২শ নারী

নকশী কাঁথা বানিয়ে ভাগ্য বদলেছেন গাইবান্ধার শেফালী বেগম। বিভিন্ন ডিজাইনের ঐতিহ্যবাহী এই কাঁথার জন্য, উদয়সাগর গ্রামটির নামই এখন হয়ে গেছে “নকশী কাঁথা পল্লী”। বর্তমানে তিনি একজন সফল নারী উদ্যেক্তা। তার হাত ধরে স্বাবলম্বী হয়েছেন, গ্রামের আরও দুইশো নারী।

বকুল, স্বদেশী, কার্পেট, লহরী কিংবা জামাই সোহাগী, ভরাট, জোর সামুক, সাধারণ কাঁথা, কাঁথা স্টেটেস এর কাঁথা, এছাড়াও এপ্লিকেটস বেড সীড, পাটি সেলাই, শাড়ী, থ্রীপিচ, নকশি চাদর, বর্তমানে নকশী কাঁথার পাশাপাশি এপ্লিক বেডশিট, নকশি চাদর, সোফার কুশন কাভারসহ হাতে তৈরি নানা পণ্য তৈরি করছেন শেফালী বেগম। নামগুলো শুনে মনে হতে পারে, কাঁথার আবার এতো বাহারি নাম? শুধু কাঁথার নামেই থেমে নেই। 

সংসারের টানাপোড়েনে দিশেহারা পলাশবাড়ী পৌরসভার উদয়সাগর গ্রামের শেফালী বেগম, ২০১৮ সালে প্রশিণ নিয়ে ২০ হাজার টাকা পুঁজিতে শুরু করেন নকশী কাঁথা সেলাইয়ের কাজ। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। নকশী কাঁথার সুনাম ছড়িয়ে পড়ার কারণে উদয়সাগর গ্রামের নাম এখন নকশী পল্লী নামেই মানুষের নিকট পরিচিতি লাভ করেছে।

দিন দিন নকশি কাঁথার কদর ও চাহিদা বাড়তে থাকায়, শেফালী বেগমের সঙ্গে যোগ দেন গ্রামের আরও দুইশ নারী। এক একটি নকশীকাঁথা সেলাই করতে সময় লাগে ১৫ থেকে ২০ দিন। প্রত্যেক নকশী কাঁথার রকমভেদে পারিশ্রমিক ৩ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা। আর্কষনীয় ডিজাইন ও গুনগত মান ভাল হওয়ায়, দেশের গ-ি পেরিয়ে এসব নকশীকাঁথা যাচ্ছে বিদেশেও।

সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় গাইবান্ধার পলাশবাড়ী পৌরসভার উদয়সাগর গ্রামে রেজাউল ইসলামের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শেফালি বেগম। সংসার জীবনে তাদের ঘর আলোকিত করে তিন ছেলে-মেয়ে। স্বামীর তেমন আয়ের উৎস না থাকায় অভাব-অনটনের মধ্যে সংসার চালানো ও ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হয় শেফালিকে। এক পর্যায়ে মুখে হতাশার ছাপ ও দিশেহারা হয়ে পরেন তিনি। 

কাজের সন্ধান করতে গিয়ে ২০১৮ সালে পলাশবাড়ী উপজেলা বিআরডিপি অফিস থেকে গাইবান্ধা সমন্বিত পল্লী দারিদ্র দূরীকরণ প্রকল্পের আওতায় নকশীকাঁথা সেলাইয়ের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন শেফালি। প্রশিক্ষণ শেষে সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে নকশী কাঁথার কাজ শুরু করেন নিজ বাড়িতে। কিছু দিনের মধ্যে তার নকশী কাঁথার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে পলাশবাড়ী উপজেলায়। এরপর থেকে সৌখিন মানুষদের কাছ থেকে নকশী কাঁথার অর্ডার পেতে থাকেন। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি শেফালিকে। 

নকশী কাঁথার চাহিদা বাড়তে থাকায় এখন নিজেই গ্রামের ২শ বেকার নারী নিয়ে নকশী কাঁথা সেলাইয়ের একটি বিশাল কারখানা গড়ে তুলেছেন। সেখানে কাজ করেন তালাকপ্রাপ্ত, বেকার এবং স্বামীর নির্যাতনের শিকার নারীরা। এখানকার নকশীকাঁথা যাচ্ছে ঢাকার মোহাম্মদপুর আড়ং ও ঢাকা নিউ মার্কেটসহ বগুড়ার এক ব্যবসায়ীর মাধ্যমে রপ্তানি হচ্ছে জর্ডানে।

নকশী কাঁথার নারী কারিগর আজিরন বেগম জানান, বাড়ির কাজের পাশাপাশি আমি এ কাজ করি। নকশী কাঁথা সেলাইয়ের মজুরির টাকায় ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা ও সংসারের কাজে ব্যয় করছি। উদয়সাগর গ্রামের শাফলা আক্তার বলেন, স্বামী দিনমজুরের কাজ করে যে টাকা পায়, তা দিয়ে ঠিকমতো সংসার চলে না। শেফালী আপার কাছে নকশী কাঁথার সেলাই শিখে তার কারখানাতেই কাজ করছি। এখানকার আয়ের টাকা ও স্বামীর রোজ মিলে এখন ভালোভাবে দিন পার করছি।

কমলা খাতুন জানান, এখন আর স্বামীর নিকট থেকে টাকা নিতে হয় না, নিজের রোজগারের টাকায় সংসারের টুকিটাকি ও হাত খরচ করতে পারচ্ছি। নকশী কাঁথার উদ্যোক্তা শেফালী বেগম বলেন, এ গ্রামের প্রতিটি নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে নকশী কাঁথার দক্ষ কারিগর করে গড়ে তুলবো। তারা নকশী কাঁথার কারখানায় কাজ করার পাশাপাশি নিজেরাও যাতে একেক জন আমার মত উদ্যেক্তা হতে পারে এবং নারীরা স্বাবলম্বী হবে। বর্তমানে ২শ নারী কর্মী নকশী কাঁথার কাজের সঙ্গে জড়িত আছে। 

পলাশবাড়ী উপজেলা বিআরডিপি কর্মকর্তা হাসানুজ্জামান জানান, স্বাবলম্বী হতে তাদেরকে আমরা চাহিদা মত ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা, কাজে সহায়তা, পণ্য বাজারে বিক্রিতে সংযোগ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। নারী উদ্যেক্তরা তাদের নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিভিন্ন মার্কেটে বিক্রি করছে। তাদের কাছ থেকে ক্রয় করে বিদেশেও রপ্তানী করছে ব্যবসায়ীরা। এ উপজেলায় গাইবান্ধা সমন্বিত পল্লী দারিদ্র দূরীকরণ প্রকল্পের আওতায় ৭০টি সমিতি গঠন করা হয়েছে। 
 

দৈনিক গাইবান্ধা

সর্বশেষ

সর্বশেষ