বৃহস্পতিবার   ১৮ এপ্রিল ২০২৪ || ৪ বৈশাখ ১৪৩১

প্রকাশিত: ১৬:৩৬, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

এগিয়ে চলার শপথ

এগিয়ে চলার শপথ
সংগৃহীত

আবারও সেই জনস্রোত। স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসা। সব বয়সী মানুষ ফুল হাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পানে ছুটে গেছেন। অগুনতি মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসার ফুলে দেখতে দেখতে ভরে উঠেছে শহীদ মিনার।

তবে এই ফুল, এমন গায়ে গা লাগা ভিড় বা আনুষ্ঠানিকতাই কি শেষ কথা? না কি অমর একুশের চেতনার সঙ্গে আরও গভীরভাবে একাত্ম হওয়া প্রয়োজন? রুখে দাঁড়ানোর ইতিহাস, ভাষা আন্দোলনের শক্তি সম্পর্কে কতটা জানে আজকের প্রজন্ম?

একুশের চেতনায় সমাজ ও জাতি গঠন আসলে কত দূরের পথ? আরও অনেক প্রশ্ন। প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করার মধ্য দিয়ে উদার অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন এবং একে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি বুধবার সারা দেশে পালিত হয়েছে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ঐতিহাসিক দিনে নিজ জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির বিপুল জাগরণ কাজে লাগানোর শপথ নিয়েছে বাঙালি। একুশ মানে মাথা নত না করা। বিদেশীদের মোড়লিপনা, চোখ রাঙানি, ভয় দেখানোর কূটনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে উন্নয়নের পথে অভিযাত্রা অব্যাহত রাখার একান্ত সংকল্পের কথা ব্যক্ত করেছে।  

এবারও ভাষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল দিনে শোক ও আনন্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। বরকত রফিক শফিক জব্বারদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয় এদিন। লাল-সবুজের পতাকার পাশাপাশি ওড়ানো হয় কালো পতাকা। অনেকে বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করেন। 

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই নানা বঞ্চনার শিকার হতে থাকে বাঙালি। সবার আগে আঘাত আসে ভাষার ওপর। পাকিস্তানিরা বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে এ অঞ্চলের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করে। ওমনি ক্ষোভে ফেটে পড়ে ছাত্র-জনতা। ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আসে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি।

এদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করে ছাত্র-জনতা। ওই মিছিলে সরকার গুলি চালালে রক্তে ভেসে যায় ঢাকার রাজপথ। তবে আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। রক্ত দিয়ে হলেও বাঙালি তার ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। গৌরবময় ইতিহাসটি স্মরণেই প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়। এবারও রাজধানীসহ সারা দেশে নানা আনুষ্ঠানিকতা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে দিবসটি পালিত হয়েছে। 

একুশের প্রথম প্রহর থেকেই ঢাকার রাস্তায় ছিল জনস্রোত। রাত ১২টা বাজার অনেক আগে থেকেই শহীদ মিনারের আশপাশে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল মানুষ। সব বয়সী মানুষের হাতে ছিল তরতাজা ফুল। শহীদ মিনারে এই ফুল দেওয়ার সূচনা করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সশরীরে উপস্থিত হয়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে জাতির পক্ষ থেকে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তারা।

জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা, তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা একে একে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। অসংখ্য সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুল দেওয়া হয়। 

একইরকম ভিড় দেখা যায় প্রভাতফেরিতে। দুপুরের আগ পর্যন্ত চলে প্রভাতফেরির আয়োজন। এ সময় সাধারণ মানুষের সংখ্যাই ছিল বেশি। বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে আসা মানুষের হাতে ছিল ফুলের তোড়া। অনেকে সন্তান বা স্ত্রীকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। একদিকে চলে ফুল দেওয়া, অন্যদিকে সেই ফুলে দারুণ সাজতে থাকে বেদি। ফুলে ফুলে শহীদ মিনারকে চমৎকার সাজিয়ে নেন স্বেচ্ছাসেবীরা। অপরূপ সুন্দর দৃশ্য দেখার জন্যও দিনভর ভিড় করে সাধারণ মানুষ। শহীদ মিনারের অদূরে দাঁড়িয়ে তাদেরকে অজস্র ছবি তুলতে দেখা যায়। 
শহীদ মিনারের এই ঢেউ ক্রমে গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। নারী পুরুষ শিশু সকলেই শোকের কালো রঙে সেজে এসেছিলেন। পোশাকে কালোর পাশাপাশি ছিল সাদা রঙের মিশেল। শাড়ি পাঞ্জাবি শার্ট যে যাই গায়ে দিয়ে বের হয়েছেন, রঙের দিক থেকে এক মনে হয়েছে। একই রঙের মনে হয়েছে অমর একুশে বইমেলাটিকে। এদিন এখানেই জনমানুষের সবচেয়ে বড় সমাবেশ ঘটেছিল।

কেউ শহীদ মিনার থেকে সরাসরি বাংলা একাডেমি বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢুকেছেন। কেউ আশপাশ এলাকা ঘুরে পা রেখেছেন মেলায়। যুদ্ধ করেই মেলায় ঢুকতে হয়েছে। বের হওয়াটাও সহজ ছিল না। তার পরও অমর একুশের দিনে একুশে বইমেলা যেন পূর্ণতা পেয়েছে। বাংলা ভাষায় লেখা বইয়ের বিশাল সংগ্রহ এখানে। ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি বই সংগ্রহ করেছেন পাঠক।

এসবের বাইরে রাষ্ট্রীয়ভাবে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় মাতৃভাষায় জ্ঞান অর্জনের সুবিধার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, মাতৃভাষায় শিক্ষা নিতে পারলে সেই শিক্ষা নেওয়া, জানা ও বোঝা অনেক সহজ হয়। বাংলা ভাষাকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মাতৃভাষাকে রক্ষা করে, মাতৃভাষার চর্চা এবং মাতৃভাষাকে আরও শক্তিশালী করে, আমাদের শিল্পকলা, সাহিত্য অনুবাদ করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে। বাঙালি জাতি যে তার ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে, তা সবার সামনে তুলে ধরারও আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।   

রাজধানীজুড়ে একুশের অনুষ্ঠানমালা ॥ এদিন রাজধানীজুড়েই ছিল অমর একুশের অনুষ্ঠানমালা। শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার পাশাপাশি সংগীত কবিতা নৃত্যসহ নানা পরিবেশনার মাধ্যমে ভাষা শহীদদের স্মরণ করা হয়। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট রায়ের বাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে একুশের অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে। শিল্পকলা একাডেমির একুশের সাংস্কৃতিক উৎসব ছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। জাতীয় জাদুঘরে ছিল সেমিনার।  

ঢাকা ক্লাবেও এদিন বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়। শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে সূচনা করা হয় অনুষ্ঠানের। পরে ছিল স্মৃতিচারণমূলক আলোচনা, গান, কবিতা এবং আবৃত্তি। অনুষ্ঠানে ক্লাবের সভাপতি আশরাফুজ্জামান খান পুটন, সংস্কৃতি বিষয়ক পরিচালক শহীদুল ইসলাম হাওলাদার, একুশে পদকে ভূষিত ক্লাব সদস্য ড. নূরুন নবী, লুৎফর রহমান রিটন, সৈয়দ আল ফারুকসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। 

জবির শ্রদ্ধা নিবেদন ॥ জবি সংবাদদাতা জানান, বুধবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে  জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের পক্ষে বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেছেন। এরপর জবি শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি, কর্মচারী সমিতি, সহায়ক কর্মচারী সমিতির পক্ষে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

এছাড়াও দিনব্যাপী ক্যাম্পাসে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয় এবং কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। এদিকে মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে জবি ক্যাম্পাসে অবস্থিত শহীদ মিনারে উপাচার্যের পক্ষে ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ুন কবীর চৌধুরী শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর বীর শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়। পরে জবির বিভিন্ন বিভাগ ও  হল, শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি (জবিকস), কর্মচারী সমিতি, সহায়ক কর্মচারী সমিতি, ছাত্রলীগ জবি শাখাসহ অন্যান্য সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়।

এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৪ উদযাপন কমিটির উদ্যোগে ভাষা শহীদ রফিক ভবন চত্বরে জবি ডে-কেয়ার সেন্টারের শিশুদের অংশগ্রহণে ‘চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা’ এবং পরবর্তীতে সন্ধ্যা হতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সংগঠনের অংশগ্রহণে ‘আমরা তোমাদের ভুলবো না’ শিরোনামে একুশের পংক্তিমালা শীর্ষক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়।

সূত্র: জনকণ্ঠ

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

সর্বশেষ

শিরোনাম

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপনদেশবাসীকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা প্রধানমন্ত্রীরঈদে বেড়েছে রেমিট্যান্স, ফের ২০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে রিজার্ভ১৪ কিলোমিটার আলপনা বিশ্বরেকর্ডের আশায়তাপপ্রবাহ বাড়বে, পহেলা বৈশাখে তাপমাত্রা উঠতে পারে ৪০ ডিগ্রিতেনেইমারের বাবার দেনা পরিশোধ করলেন আলভেজ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ কী? কীভাবে করবেন?বান্দরবানে পর্যটক ভ্রমণে দেয়া নির্দেশনা চারটি স্থগিতআয়ারল্যান্ডের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীকে শেখ হাসিনার অভিনন্দনসুইজারল্যান্ডে স্কলারশিপ পাওয়ার উপায় কিবৈসাবি উৎসবের আমেজে ভাসছে ৩ পার্বত্য জেলাসবাই ঈদের নামাজে গেলে শাহনাজের ঘরে ঢুকে প্রেমিক রাজু, অতঃপর...