শুক্রবার   ২৪ মে ২০২৪ || ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

প্রকাশিত: ১০:১৯, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩

জলাবদ্ধ জমিতে ডালি পদ্ধতিতে সবজি চাষে সফলতা

জলাবদ্ধ জমিতে ডালি পদ্ধতিতে সবজি চাষে সফলতা

অনাবাদি পতিত ও জলাবদ্ধ জমিতে সমন্বিত কৃষির আওতায় ডালি পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদন করে সাড়া ফেলেছে কৃষিবিভাগ। পতিত ও জলাবদ্ধ বিলের জমি পরিস্কার করে পানির উপর ডালি স্থাপন করে বিভিন্ন প্রকার সবজি চাষাবাদ করা হচ্ছে। কৃষি বিভাগের উদ্ভাবিত নতুন এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন এলাকার কৃষকেরা।

এ পদ্ধতিতে সবজি চাষ সম্প্রসারিত হলে সারা বছর পানিতে ডুবে থাকা অনাবাদি জমিও আবাদি জমিতে রূপান্তরিত হবে বলে মনে করছেন কৃষি বিভাগ। বিলের পানিতে বাঁশের খুটির উপর ঝুলে আছে বিশেষ পদ্ধতিতে বানানো ডালি। আর তার উপরে নেটে ঝুলছে নানা ধরনের সবজি। বাঁশ, নাইলনের শক্ত নেট ও ছিদ্রযুক্ত পলিথিন দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে বানানো হয়েছে এসব ডালি। ভার্মি কম্পোজ মাটি আর জৈব সার ভর্তি করে ডালিতে রোপণ করা হয়েছে লাউ, কুমড়া, শশা, ধুন্দল ও চিচিংগা। দুই মাস আগে রোপণ করা গাছে এখন ঝুলছে নানা ধরনের সবজি। বাঁশের তৈরি বান দিয়ে ঘিরে করা হচ্ছে মাছ চাষও। এছাড়া রাস্তার খাদে গোড়া পদ্ধতিতে ও ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি ও মশলা জাতীয় ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে।

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলায় ছোট বড় বেশ কয়েকটি বিল রযেছে। বছরের অধিকাংশ সময় এই সব বিলের আংশিক জমি পানিতে ডুবে থাকা আর শুকনো মৌসুমেও কোমর পানি বা হাটু পানি থাকায় সেখানে কোন ফসল উৎপাদন হতো না। ফলে প্রায় ৫০ বছর ধরে এসব জমি অনাবাদি পড়ে ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনার অতিমাত্রার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দেশের কৃষি ও কৃষি বিভাগকে পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনার ঘোষণা দেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনী এলাকা টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়ার উন্নয়ন প্রতিনিধি শহীদ উল্লা খন্দকার ও কৃষি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বালাডাঙ্গা গ্রামের পুবের বিলে প্রধানমন্ত্রীর পৈত্রিক পতিত জমিকে আবাদি জমিতে রুপ দিয়েছে কৃষি বিভাগ। এভাবে সবজি চাষ হচ্ছে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বালাডাঙ্গা গ্রামের পূবের বিলে প্রধামন্ত্রীর পৈত্রিক জমিতে।

টুঙ্গিপাড়া উপজেলার জোয়ারিয়া গ্রামের প্রসেনজিৎ দাস বলেন, কৃষি বিভাগের সহযোগীতায় আমরা ডালি পদ্ধতিতে সবজি চাষাবাদ শিখেছি। এ পদ্ধতিতে সবজি চাষ করলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। একই খরচে ২ মৌসুম ভাল ফলন হয়। আগামী বর্ষা মৌসুমে আমি আমার জলাবদ্ধ জমিতে এই পদ্ধতিতে সবজি চাষ করব। একই উপজেলার পাথরঘাটা গ্রামের তপন বিশ্বাস বলেন, এ পদ্ধতিতে সবজি চাষ দেখে আমরা অভিভূত হয়েছি। ফলনও খুব ভাল হয়েছে। এ পদ্ধতিতে রাসাযনিক সার ও কিটনাশক লাগে না। একবার বাশ কিনে ডালি লাগিয়ে শুরু করলে দুই বছর পর্যন্ত আবাদ করা সম্ভব। এতে খরচ কম হয়। টুঙ্গিপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন বলেন, জলাবদ্ধ ও পতিত জমিতে আমরা যখন এই পদ্ধতিতে চাষ শুরু করি তখন এলাকার মানুষ আমাদের নিয়ে হাসাহাসি করেছে এখন আমরা বিভিন্ন জাতের সবজি ফলিযে সফল হয়েছি। আগামিতে আরও ব্যাপক ভাবে এই চাষ শুরু করব।

গোপালগঞ্জ কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ আব্দুল কাদের সরদার বলেন, ডালি পদ্ধতিতে চাষ গোপালগঞ্জে মডেল হিসাবে শুরু করা হয়েছে। শুরুতেই আমরা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পেয়েছি। এই পদ্ধতিতে চাষ দেখে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। আগামীতে জলাবদ্ধ ও পতিত জমিতে কৃষকেরা নিজ উদ্যোগে ডালি পদ্ধতিতে চাষ করতে আগ্রহী হচ্ছেন। আগামীতে শুধু টুঙ্গিপাড়া নয় জেলার অন্যান্য উপজেলায়ও এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ হবে। ভাসমান বেডে মসলা জাতীয় ফসল চাষ ও ডালি পদ্ধতির উদ্ভাবক ও প্রকল্প পরিচালক বিজয় কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, ডালি পদ্ধতিতে সবজি চাষ করলে রাসায়নিক সার বা কীটনাশক লাগে না। ভাসমান বেডে সবজি উৎপাদনের পর কচুরিপনা পচা মাটিতে দিয়ে সবজি লাগানোর ফলে অর্গানিক সার পাওয়া যায়। আর এই কচুরিপনা পচা ব্যবহার করে প্রচুর পরিমাণ স্বাস্থ্য সম্মত সবজি উৎপাদন করা যায়। এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে কৃষক লাভবান হবেন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন প্রতিনিধি মোঃ শহীদউল্লা খন্দকার বলেন, এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি থাকবে না প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণার পর তিনি কৃষি বিভাগের সংগে যোগাযোগ করে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়ার জলাবদ্ধ ও পতিত জমি চাষের আওতায় আনতে কাজ শুরু করেন। চিচিঙ্গারি মৌসুমে চিচিঙ্গা হবে, লাউয়ের মৌসুমে লাউ হবে অন্য কিছু হবে না এমন ধারণা বদলেছে। এ পদ্ধতিতে সব ধরনের সবজি ও ফলমুল সারা বছর পাওয়া যাবে। বর্ষাকালে আমাদের দেশের অধিকাংশ জমি পানিতে তলিয়ে থাকে। এই ডালি পদ্ধতিতে বর্ষাকালে পানিতে তলিয়ে থাকা জমিতে সবজি চাষ করা সম্ভব। নাটোরের চিনিডাঙ্গায় কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ প্রথম এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করে। সেখানে সফল হওয়ার পর টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া ও মুকসুদপুরে এই পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে লাউ, শশা, চিচিঙ্গা, কুমড়াসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করা যাবে।

দৈনিক গাইবান্ধা

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

সর্বশেষ