শনিবার   ১৫ জুন ২০২৪ || ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

প্রকাশিত: ০৭:৪৩, ৭ মে ২০২৩

১৯টি দিয়ে শুরু করে ২০০ ছাগলের মালিক জাকারিয়া

১৯টি দিয়ে শুরু করে ২০০ ছাগলের মালিক জাকারিয়া

তখন ঘোর করোনাকাল। ডিমের চাহিদা বাড়বে! এমন ধারনায় লেয়ার মুরগির খামার গড়েছিলেন দুই বন্ধু মিলে। এরপর ৫ লাখ টাকা লোকসান দিয়ে ছেড়েছেন ব্যবসা। মুরগির খামার সরিয়ে মাত্র ১৯টি ছাগল দিয়ে শুরু হয় পথচলা। এখন ছাগল খামারে বাজিমাত করেছেন মো: জাকারিয়া। ছোট বড় মিলিয়ে তাঁর খামারে রয়েছে দুই’শ ছাগল!

জাকারিয়ার গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জে। একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে রাজশাহীতে কর্মরত কয়েক বছর ধরে। চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা দাঁড় করাতেই রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের কালিয়াপাড়া এলাকায় ৬ বিঘাজুড়ে গড়ে তুলেছেন ওয়াফা এগ্রো ফার্ম।

গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে তাঁর খামারে গিয়ে দেখা যায়, গলায় হলুদ ফিতার সাথে ট্যাগ লাগানো ছোট-বড় মাঝারি গড়নের ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগল। খামারে ঢুকতেই পলাশ মন্ডল হাঁক দিয়ে আরেকজনকে ডাকছেন-“জলদি আসেন ভাই, বাচ্চা হবে”। প্রায় মিনিট ত্রিশেক পর এক ছাগল বাচ্চা প্রসব করলো। খামারের আরেক কর্মী রমজান আলী খুশিতে বললেন-“কত্তোবড় ব্যাটাছেলে হয়েছে কাকা দেখেন!

খামার ঘুরে দেখার পাশাপাশি কথা হয় এই খামারির সাথে। তিনি বলেন, এক বন্ধু দীর্ঘদিন ধরে মুরগির খামারি। লাভের আশায় সেই বন্ধুর সাথে তিনিও মুরগির খামারে বিনিয়োগ করেন। ৩ হাজার লেয়ার মুরগির খামার গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু করোনা মহামারিতে ডিম বিক্রি করতে না পারা আর গামবোরোর কারণে মারা যায় মুরগি। ফলে ৫ লাখ টাকা লোকসান দিয়ে ব্যবসা থেকে সরে পড়েন।

তিনি বলেন, ছাগলের খামারের জায়গাটুকুন মুরগির খামারের জন্য তারা লিজ নিয়েছিলেন। এখন সেই মুরগির জায়গাতে ছাগল রাখার শেড তৈরি করেছেন। কাঠের পাটাতন দিয়ে মাটির দুই ফুট উপরে করেছেন ছাগলের বাসস্থান। মূল খামারের জায়গা বিঘা খানেক হলেও বাঁকি সাড়ে ৩ বিঘায় ঘাস চাষ করছেন। পুরো খামার ঘেরাও করা রয়েছে আর ঢুকতেই পাশে রয়েছে কোয়ারেন্টাইন সেল। যেখানে অসুস্থ ছাগলের চিকিৎসা কার্যক্রম ও বাজার থেকে নতুন ছাগল কিনে সংরক্ষণ করা হয় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত।

জাকারিয়া জানান, ২০২১ সালের ১৯ মে ১৯টি ছাগল দিয়ে শুরু করে এখন তাঁর খামারে রয়েছে ২০০ টি ছাগল। ১০টি ছাগলের জন্য একটি করে ব্লাক বেঙ্গল জাতের পাঁঠা পালন করছেন। সব মিলিয়ে এই পর্যন্ত খামারে তার বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। ইতোমধ্যে দেড় বছরের মাথায় বিনিয়োগ উঠে এসেছে। সামনে বছর থেকে লাভের আশা করছেন তিনি। সুষ্ঠু পরিকল্পনা মাফিক ছাগলের খামার করলে লোকসানের ঝুঁকি নেই। এখন থেকে বাচ্চা বাড়ানোর পাশাপাশি নিশ্চিত লাভবান হওয়ার আশা করছেন। ফলে মুরগির চেয়ে ছাগলে বাজিমাত বলেই মনে করছেন এই খামারি।

এই উদ্যোক্তার দাবি, তারা ছাগলকে প্রাকৃতিক খাবার দেন। খৈল ভাঙ্গা, আটা, গমের ভুষি, কাঁচা নেপিয়ার জাতের ঘাস। দেন নিয়মিত ভ্যাকসিনও। বাজারে এমন ছাগলের চাহিদা বেশ ভালো। গত কুরবানিতে কিছু খাসি তারা বাজারে তুলেছিলেন সাড়াও পেয়েছেন। আসছে কুরবানিতে উৎকৃষ্ট মানের খাশি সরবরাহ করতে পারবেন তারা।

ওয়াফা এগ্রো ফার্মে চারজন কর্মী কাজ করেন। এদেরই একজন মো. পলাশ মণ্ডল। নওগাঁর নিয়ামতপুরের শিবপুর এলাকার বাসিন্দা। পলাশ পেশায় কৃষি শ্রমিক ছিলেন। বাড়িতে গরু-ছাগল রয়েছে তার। সেই অভিজ্ঞতা থেকে ছাগলের খামারে কাজ করছেন। খামারে তাঁর বেতন ১৫ হাজার টাকা। চারজনকে মোট বেতন দিতে হয় ৫০ হাজার টাকা।

পলাশ মণ্ডল জানান, তারা চারজন কর্মী রয়েছেন। একেকজন একেক কাজ করেন। তিনি ছাগলের খাবার দেয়া থেকে দেখাশোনা করেন। তার হাতে অনেক ছাগলের বাচ্চা প্রসব হয়েছে। নিজের সন্তানেরমত এগুলো লালনপালন করে বড় করছেন। এই খামারে তাঁর নিজের হাতে প্রায় দেড়শ ছাগল বাচ্চা প্রসব করেছে। আর এসব ছাগল তাঁকে দেখলে ম্যা-ম্যা করতে করতে পেছনে দৌড়ায়। তারও নাকি ভালো লাগে! মায়া জন্মেছে তাঁর আর ছাগলের মধ্যে।

খামারের আরেক কর্মী রমজান আলী। তিনি ছাগলের রোগ-বালাইয়ের বিষয়টি খেয়াল রাখেন। রমজান জানান, এই জাতের ছাগলের তেমন রোগ বালাই নেই। ঠাণ্ডা এবং পাতলা পায়খানা হয়। কোনো ছাগল আক্রান্ত হলে তার তথ্য রেজিস্টারে সংরক্ষণ করেন। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ওষুধ দেন। নিয়মিত ভ্যাকসিনও দেন। ছাগলের ঠাণ্ডা না সারলে নিউমোনিয়া হয়। এটিই সবচেয়ে মারাত্মক। ফলে এনিয়ে তাদের সতর্ক থাকতে হয়।

খামার শুরুর আগে বেসিক ট্রেনিং নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন রাজশাহীর ছাগল উন্নয়ন খামারের উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমাদের দেশে মূলত ছাগল পালন হয় গতানুগতিক পদ্ধতিতে। কিন্তু খামার করতে গেলে সবার আগে খাবারের সংস্থান করতে হবে। ৭০ শতাংশ ঘাস এবং ৩০ শতাংশ দানাদার খাবার দেওয়া গেলে ভালবান হওয়া যায়।

দৈনিক গাইবান্ধা

সর্বশেষ

সর্বশেষ