• শুক্রবার   ০৩ ডিসেম্বর ২০২১ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১৯ ১৪২৮

  • || ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

গর্ভবতীর সঙ্গে লোহা-রসুন-দিয়াশলাই রাখা কি জরুরি?

দৈনিক গাইবান্ধা

প্রকাশিত: ৯ নভেম্বর ২০২১  

নারী গর্ভবতী হলেই মানতে হয় অনেক নিয়ম। যুক্তিযুক্ত স্বাস্থ্য সম্মত নিয়ম কানুন তো মানতেই হবে। কিন্তু গর্ভবতী নিজের কিংবা গর্ভের বাচ্চার ক্ষতি হওয়ার আশংকায় সঙ্গে ম্যাচ (দিয়াশলাই), রসুনের কোশ, লোহার টুকরা, তাগা (কালো রশি), গরুর হাঁড় ইত্যাদি রাখতে হয়। এগুলো রাখা কি বাধ্যতামূলক নাকি কুসংস্কার? এ সম্পর্কে ইসলামের দিকনির্দেশনা কী?

দীর্ঘকাল থেকেই নানান কুসংস্কারের বেড়াজালে এখনও আটকে আছে ইসলামে বিশ্বাসী অনেক মুসলমান। গর্ভবতী নারী কিংবা প্রসূতি নারীর সঙ্গে এসব কিছু রাখা সম্পূর্ণ কুসংস্কার। এসবের সঙ্গে ইসলামের ন্যূনতম সম্পর্কও নেই।

যুগের পর যুগ ধরে এখনো অনেকে গর্ভবতী ও নবজাতকের ওপর জিন-শয়তানের আক্রমণ লাগার ভেয়ে কিংবা জাদু-টোনা ও বদনজর লাগতে পারে এমন আশংকায় এসব জিনিস ব্যবহার করে। অথচ এসব জিনিস এর কোনো প্রতিকার করার ক্ষমতা রাখে না। যা শুধুই কুসংস্কার।

বরং যদি কেউ শয়তান-বদজিনের আক্রমণ, বদনজর রোধে এসবে বিশ্বাস করে গর্ভবতী কিংবা নবজাতককে লোহার টুকরা, গরুর হাঁড়, রসুন ও দিয়াশলাই সঙ্গে রাখতে বাধ্য করে তবে তা শিরক বলে গণ্য হবে। কারণ কোনো জড়পদার্থ মানুষকে ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না।

বরং একমাত্র আল্লাহই সব বালা-মুসিবত, ক্ষয়-ক্ষতি এবং সৃষ্টির অনিষ্টতা থেকে উদ্ধারকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন-

১. وَ اِنۡ یَّمۡسَسۡکَ اللّٰهُ بِضُرٍّ فَلَا کَاشِفَ لَهٗۤ اِلَّا هُوَ ۚ وَ اِنۡ یُّرِدۡکَ بِخَیۡرٍ فَلَا رَآدَّ لِفَضۡلِهٖ ؕ یُصِیۡبُ بِهٖ مَنۡ یَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِهٖ ؕ وَ هُوَ الۡغَفُوۡرُ الرَّحِیۡمُ

‘আর যদি আল্লাহ আপনাকে কোনো ক্ষতির স্পর্শ করান, তবে তিনি ছাড়া তা মোচনকারী আর কেউ নেই। আর যদি আল্লাহ আপনার মঙ্গল চান, তবে তাঁর অনুগ্রহ প্রতিহত করারও কেউ নেই। তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে তার কাছে সেটা পৌঁছান। আর তিনি পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।’ সুরা ইউনুছ : আয়াত ১০৭)

২. অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা এ কথাটি এভাবে বলেছেন-

وَ اِنۡ یَّمۡسَسۡکَ اللّٰهُ بِضُرٍّ فَلَا کَاشِفَ لَهٗۤ اِلَّا هُوَ ؕ وَ اِنۡ یَّمۡسَسۡکَ بِخَیۡرٍ فَهُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ

‘আর যদি আল্লাহ আপনাকে কোনো দুর্দশা দ্বারা স্পর্শ করেন, তবে তিনি ছাড়া তা মোচনকারী আর কেউ নেই। আর যদি তিনি আপনাকে কোনো কল্যাণ দ্বারা স্পর্শ করেন, তবে তিনি তো সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।’ (সুরা আল-আনআম : আয়াত ১৭)

সুতরাং আয়াত দুটি থেকে বোঝা গেলে যে, কোনো লোহার টুকরা, রসুন, ম্যাচ, কালো সুতা, গরুর হাঁট ইত্যাদি মানুষকে অমঙ্গল করতে পারে না। সুস্থ ও ভালো থাকা মহান আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। তাই এসবে বিশ্বাস করাই শিরকের শামিল।

আল্লাহ হেফাজত করুন! অথচ ইচ্ছা করে এসব কাজ করার অর্থই হলো শিরকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়া; নিজের নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, আমল-ইবাদত-বন্দেগি নষ্ট করে চিরস্থায়ী জাহান্নামের দিকে ধাবিত হওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।

গর্ভবর্তী কিংবা নবজাতকের জন্ম হলে যা করণীয়

জাদু-টোনা, জিন-শয়তান ও বদনজরসহ যাবতীয় অনিষ্টতা থেকে মুক্তি পাওয়ার ইসলামি উপায় রয়েছে। এসব থেকে আত্মরক্ষার জন্য সকাল-সন্ধ্যা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পরে এবং ঘুমের আগে হাদিসে বর্ণিত দোয়া ও জিকিরের আমল করা। তাহলো-

১. সকাল-সন্ধ্যায় সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস তিনবার পড়া এবং আয়াতুল কুরসি একবার পড়া।

২. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর উক্ত তিনটি সুরার পাশাপাশি আয়াতুল কুরসি একবার পড়া।

৩. রাতে ঘুমের আগে উক্ত তিন সুরা পড়ে দুই হাত একত্রিত করে তাতে ফুঁ দিয়ে মাথা থেকে শরীরের যতটুকু পৌঁছানো সম্ভব তাতে তিনবার মাসেহ করা। সঙ্গে আয়াতুল কুরসিও পড়া।

৪. কোনো কারণে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলে- ‘বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ’ বলে ঘরতে বের হওয়া। এবং নির্ধারিত গন্তব্যে পৌছলে এ দোয়া পড়া-

أَعُوذُ بِكلِمَاتِ الله التّامّاتِ مِن شَرّ مَا خَلَقَ

উচ্চারণ : আউজুবি কালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খলাকা।

অর্থ : ‘আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমার ওসিলায় তিনি যা সৃষ্টি করেছেন সেগুলোর অনিষ্টা থেকে তাঁর কাছেই আমি আশ্রয় চাই।’

হজরত খাওলাহ বিনতে হাকিম রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনও স্থানে পৌঁছে পাঠ করে-

أَعُوذُ بِكلِمَاتِ الله التّامّاتِ مِن شَرّ مَا خَلَقَ

উচ্চারণ : আউজুবি কালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খলাকা।

(এতে) কোনো কিছুই তার ক্ষতি সাধন করতে পারবে না; যতক্ষণ না সে ওই স্থান থেকে (অন্য কোথাও) চলে যায়।’ (মুসলিম)

ইসলাম মানুষকে এমন সুন্দর জীবন ব্যবস্থা দিয়েছে যে, দুনিয়ার প্রতি কাজে কাজে, প্রতিটি পদক্ষেপে  অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার সুযোগ দিয়েছেন। যার ফলে বান্দা অনেক বিপদ-আপদ এমনকি কুসংস্কার থেকেও মুক্তি পায়।

সুতরাং মুমিন মুসলমানের সব গর্ভবতী ও প্রসূতি নারীর উচিত, নিজের ও নিজের গর্ভের কিংবা শিশু সন্তানের অনিষ্টতা থেকে বেঁচে থাকতে সব সময় মহান আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে কোরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনা মেনে চলা।

এমনকি বাহির থেকে বাড়িতে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়া, ঘরে প্রবেশের সময় দোয়া ও বিসমিললাহ বলে প্রবেশ করা।, টয়েলেটে যাওয়ার সময় যেমন দোয়া পড়ে যাওয়া; তেমনি টয়লেট থেকে বে হয়েও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। খাবারের সময় বিসমিল্লাহ বলে শুরু করা, স্ত্রী সহবাসের আগে দোয়া পড়া। সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত ও সুরা তাওবার শেষ দুই আয়াত তেলাওয়াত করা। বেশি বেশি তাওবাহ-ইসতেগফার পড়া। যা সব মানুষকেই জিন-শয়তানের অনিষ্টতা, জাদু-টোনা থেকে রক্ষা করবে। ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে এসব কুসংস্কার থেকে মুক্ত থাকার পাশাপাশি কোরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনায় নিজেদেরকে যাবতীয় অনিষ্ঠতা থেকে মুক্ত রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।

দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা