• বৃহস্পতিবার   ২১ অক্টোবর ২০২১ ||

  • কার্তিক ৬ ১৪২৮

  • || ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

মহানবী (সা.) যেভাবে সমাজ বদলে দেন

দৈনিক গাইবান্ধা

প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর ২০২১  

মহানবী (সা.)-এর পৃথিবীতে আগমনের মাস রবিউল আউয়াল। এটাকে কোনো সংশয় ছাড়াই সৌভাগ্যের মাস বলা যায়। কেননা, তাঁর আগমনের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অবশ্যই তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে একজন রাসুল এসেছেন। তোমাদের যা বিপন্ন করে তা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি তিনি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ১২৮)

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭)

উভয় আয়াতের মূল বক্তব্য প্রায় এক। তা হলো নবীজি (সা.) মানবজাতির জন্য রহমত ও অনুগ্রহ হিসেবে আগমন করেছেন। এটা তাঁর কোনো অমূলক প্রশংসা নয়; বরং আসমান ও জমিনের স্রষ্টা মহান আল্লাহর ঘোষণা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের আগে পৃথিবীর কী অবস্থা ছিল এবং পৃথিবী কোন দিকে যাচ্ছিল—তা ইতিহাসের দিকে তাকালেই জানা যায়। মানুষ নিজেদের মধ্যে শ্রেণি ও বৈষম্যের দেয়াল তুলে রেখেছিল। একদল মানুষ নিজেদের ধন-সম্পদ ও জীবনোপকরণের নিয়ন্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং অন্য দল ছিল তাদের দাস ও সেবক। তাদের শুধু কাজে-কর্মে ব্যবহার করা হতো না; বরং ধনী ও শাসকদের বিনোদনের জন্যও প্রাণ দিতে হতো বহু মানুষকে। বিভিন্ন রাজকীয় উৎসবে মানুষ বলি দেওয়া হতো, হিংস্র পশুর সঙ্গে লড়াই করতে নামিয়ে দিয়ে বলা হতো হয়তো পশুকে পরাজিত কোরো, নতুবা মৃত্যুবরণ কোরো। হাজার হাজার মানুষ তাদের মৃত্যুর দৃশ্য উপভোগের জন্য উপস্থিত হতো। অন্যদিকে রাজা-বাদশাহ ও তাদের পোষ্যরা সীমাহীন বিলাসী জীবনযাপন করত। রাজ দরবারের জৌলুস বাড়াতে তারা যে পরিমাণ সম্পদের অপচয় করত তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো।

নারীরা ছিল ভোগ্য পণ্যের মতো। তাদের মূল্যায়ন ও মর্যাদার ভিত্তিও ছিল তা। পুরুষের তুলনায় তাদের পিছিয়ে পড়া এবং অপছন্দনীয় মনে করা হতো। পরিবারে মা-বাবার সঙ্গে ভাইয়েরও সেবা করতে হতো তাদের। তাদের জন্মকেই অশুভ মনে করা হতো। রাসুলুল্লাহ (সা.) নারী ও দাসদের মানবিক অধিকার ও মর্যাদা দান করেছেন এবং তাদের মৌলিক অধিকারে অন্যসব মানুষের সমপর্যায়ের বলেছেন। তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা হলো—‘সব মানুষ এক আদমের সন্তান। সবাই সমান। সাদা হোক বা কালো, আরব হোক বা অনারব কেউ কারো থেকে ছোট বা বড় নয়; বরং মানুষের ভালো কাজ ও আল্লাহভীতিই তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে।’

তিনি শুধু বলেননি, নিজেই তা বাস্তবায়ন করেছেন এবং বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন যে কিভাবে মানবসমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হয়। তিনি ইরানের সালমান ফারসি (রা.), আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ বেলাল ও রোমের (ইউরোপের) সুহাইবে রুমি (রা.)-কে সেভাবেই সঙ্গে রেখেছেন যেভাবে নিজ গোত্রীয় মুমিনদের রেখেছিলেন। জায়িদ ইবনে হারিস (রা.)-কে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে সন্তানের মর্যাদা দেন এবং নিজের ফুফাতো বোনের সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে বিশ্ববাসীকে চমকে দেন।

মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন নারীর অধিকার আদায় করতে, তাদের উত্তরাধিকার সম্পদে অংশীদার করতে, মা-বাবাকে কন্যাশিশুর বিশেষ যত্ন নিতে, স্ত্রীকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ভরণ-পোষণ দিতে, বোঝা-পড়া না হলে ভদ্রতার সঙ্গে আলাদা হয়ে যেতে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন সম্পদ ব্যয়ে ভারসাম্য রক্ষা করতে, গরিব-অসহায় মানুষের সাহায্য করতে, কৃপণতা ও অপচয় থেকে বেঁচে থাকতে। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে ধনীর সম্পদে দরিদ্র্যের অধিকার (জাকাত) ঘোষণা করেছেন। নিষিদ্ধ করেছেন কারো সম্পদ আত্মসাৎ করা, কারো সম্ভ্রম নষ্ট করা, কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করাকে। এসব কাজের নির্দেশ দিয়েই তিনি শেষ করেননি; বরং এমন একটি সমাজ তৈরি করেছেন, যারা সাম্য, সুবিচার, সহমর্মিতা ও দ্বিনের আনুগত্যকে জীবনের অংশ বানিয়ে নিয়েছিল। ইসলামের ইতিহাসে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। আবু বকর (রা.) সেনা অভিযানের সময় বলে দিতেন শত্রু এলাকায় উপাসনালয়ে উপাসনারত ব্যক্তিদের যেন কোনোভাবে বিরক্ত করা না হয়। কোনো অঞ্চলে শুধু তখনই সেনা পাঠানো হতো, যখন ইসলামী মূলনীতি অনুসারে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান অসম্ভব হয়ে পড়ত। বিজয়ের পরে সাধারণ মানুষের কোনো সম্পদ কেড়ে নেওয়া হতো না এবং তাদের ধর্মান্তরে বাধ্য করা হতো। ওমর (রা.) যখন বায়তুল মোকাদ্দাসে প্রবেশ করছিলেন তখন তাঁর দাস বাহনের ওপর বসা ছিল এবং তিনি লাগাম ধরে হাঁটছিলেন। পারস্য সম্রাট পরাজিত হওয়ার পর তার মণি-মুক্তায় অলংকৃত রাজমুকুট একজন অজ্ঞাতনামা মুসলিম সেনাপতির হাতে তুলে দেন এবং বলেন, আল্লাহ আমার নাম জানেন।

এটাই ছিল নবীজি (সা.)-এর হাতে গড়ে ওঠা সমাজের উপমা। যে সমাজের প্রত্যেকে পরকালীন কল্যাণকে প্রাধান্য দিত, দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের প্রতি নিরাসক্ত ছিলেন, সত্যের জন্য জীবন উৎসর্গকারী ছিলেন, লেনদেনে ন্যায়ানুগ ছিলেন, অসহায় ও দুর্বল মানুষের প্রতি সহমর্মী ছিলেন, পশু-পাখির প্রতি ছিল তাদের মমত্ববোধ। এক কথায় ইসলামী শরিয়তে বর্ণিত প্রতিটি অধিকার আদায়ে তারা বদ্ধপরিকর ছিলেন। এসব গুণের কারণে তারা নিজেদের জীবনে এবং সমাজে এমন পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন এবং তাদের দ্বারা এতটা উন্নয়ন সম্ভব হয়, যার সামনে মানবজাতির অতীতের সব অর্জন ম্লান হয়ে যায়। তাদের নেতৃত্বে পৃথিবীতে অভ্যুদয় ঘটে মানবজাতির নেতৃত্ব দানকারী এক নতুন জাতির।

তামিরে হায়াত থেকে

মো. আবদুল মজিদ মোল্লার ভাষান্তর

দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা