• মঙ্গলবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||

  • আশ্বিন ৫ ১৪২৮

  • || ১১ সফর ১৪৪৩

কোরবানি নিয়ে বিশ্বনবীর গুরুত্বপূর্ণ ১৭ দিকনির্দেশনা

দৈনিক গাইবান্ধা

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০২১  

কোরবানি ইসলামী বিধানগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক বিধান। সুন্নাতে ইবরাহিমি কোরবানির দিনকে ঈদুল আজহা বা ইয়াওমুন নাহর বলা হয়। সারাবিশ্বে মুসলিমনদের কাছে এ দিনটি কোরবানির ঈদের দিন হিসেবে পরিচিত। স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন, প্রাপ্তবয়স্ক, মুসলিম যদি ‘নিসাব’ পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকেন, তাদের পক্ষ থেকে একটি কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব বা আবশ্যক। 

রাসূলুল্লাহ (সা.) কোরবানি নিয়ে ১৭টি জরুরি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাহলো-

১০.কোরবানির পশু জবেহ ও নহর করা
তবে নিয়ম হলো- গরু, ছাগল, দুম্বা জবেহ করা এবং উট নহর করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) এমনই করেছেন। একাধিক হাদিসে এসেছে-
> হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) দুইটি সাদা-কালো বর্ণের (বড় শিং বিশিষ্ট) নর দুম্বা কোরবানি করেছেন। আমি দেখেছি, তিনি দুম্বা দুটির গর্দানে পা রেখে ‘বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার’ বললেন। অতঃপর নিজ হাতে জবেহ করলেন।’ (বুখারি, মুসলিম)

> হজরত জাবির (রা.) বর্ণনা করেন, একটি দীর্ঘ হাদীসে এসেছে, ‘অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) কোরবানির স্থানে এলেন এবং নিজ হাতে তেষট্টিটি উট নাহর করলেন। ( মুসলিম, আবু দাউদ)

১১. স্ত্রীদের পক্ষ থেকে স্বামীর কুরবানি
> হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) তার স্ত্রীদের পক্ষ থেকে গরু দ্বারা কুরবানি করেছেন।’ (বুখারি, মুসলিম)

গরু দ্বারা কুরবানির বিষয়টি হজরত জাবির  (রা.) -এর সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। (মুসলিম)

১২. কোরবানির পশুর বয়স
হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমরা (কোরবানিতে) ‘মুছিন্না’ (পশু) ছাড়া জবেহ করবে না। তবে সংকটের অবস্থায় ছয় মাস বয়সী ভেড়া-দুম্বা জবেহ করতে পারবে।’ (মুসলিম, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)

তবে কোরবানির পশুর বয়স হতে হবে এমন-
> উট : অন্তত পাঁচ বছর বয়সী হতে হবে।
> গরু-মহিষ : অন্তত দুই বছর বয়সী হতে হবে।
> ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা এক বছর হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে উপরোক্ত হাদিস থেকে জানা যায় যে, তা ছয় মাসের হলেও চলবে, এর কম হওয়া যাবে না।

১৩. যে পশু কোরবানি করা যাবে না
> হজরত বারা ইবনে আজেব (রা.) কুরবানির পশু সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) হাত দিয়ে ইশারা করেছেন -আমার হাত তো তার হাত থেকে ছোট এবং বলেছেন, ‘চার ধরনের পশু দ্বারা কোরবানি করা যায় না-
- যে পশুর এক চোখের দৃষ্টিহীনতা স্পষ্ট;
- যে পশু অতি রুগ্ণ;
- যে পশু সম্পূর্ণ খোড়া এবং
- যে পশু এত শীর্ণ যে, তার হাড়ে মগজ নেই।’

লোকেরা বলল, আমরা তো দাঁত, কান ও লেজে ত্রুটিযুক্ত প্রাণী (দ্বারা কোরবানি করা) ও অপছন্দ করি? তিনি বললেন, যা ইচ্ছা অপছন্দ করতে পার। তবে তা অন্যের জন্য হারাম করো না।’ (ইবনে হিব্বান, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)

> হজরত আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের আদেশ করেছেন, আমরা যেন (কোরবানির পশুর) চোখ ও কান ভালোভাবে লক্ষ্য করি এবং ওই পশু দ্বারা কোরবানি না করি, যার কানের অগ্রভাগ বা পশ্চাদভাগ কর্তিত। তদ্রূপ যে পশুর কান ফাড়া বা কানে গোলাকার ছিদ্রযুক্ত।’ (আবু দাউদ, নাসাঈ, তিরমিজি)

> অন্য হাদিসে হজরত আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিং-ভাঙ্গা বা কান-কাটা পশু দ্বারা কোরবানি করতে নিষেধ করেছেন।’ (ইবনে মাজাহ, আবু দাউদ)

মনে রাখতে হবে
এই কোরবানি প্রকৃতপক্ষে বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহর দরবারে নজরানা নিবেদনের নাম। এ জন্য এটা জরুরি যে, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোত্তম ও ভালো পশু নির্বাচন করা। এটা খুবই খারাপ কথা যে, লোলা, ল্যাংড়া, অন্ধ, কানা, অসুস্থ, পক্ষাঘাতগ্রস্ত, শিং ভাঙ্গা ও কানকাটা কম দামের পশু আল্লাহর দরবারে পেশ করা।

বরং কোরবানির পশুর মূলনীতি হবে কোরআনের এ নির্দেশনার মতো- لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتّٰی تُنْفِقُوْا مِمَّا تُحِبُّوْنَ অর্থাৎ তোমরা পুণ্যের স্তরে পৌঁছাতে পারবে না, যে পর্যন্ত না তোমাদের প্রিয় ও পছন্দনীয় বস্তু আল্লাহর রাহে খরচ করবে।

সুতরাং কোরবানি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর এসব দিকনির্দেশনার প্রাণবস্তু ও এগুলোর মুখ্য উদ্দেশ্য এটাই। (মাআরিফুল হাদীস)

১৪. গরু ও উটে কোরবানির শরিক
হজরত জাবির (রা.) বলেন, আমরা হজ্বের ইহরাম বেঁধে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে বের হলাম। …তিনি আমাদের আদেশ করলেন যেন আমরা প্রতিটি উট ও গরুতে ৭ জন করে শরীক হয়ে কোরবানি করি।’ (মুসলিম)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, (একটি) গরু ৭ জনের পক্ষ থেকে এবং (একটি) উট ৭ জনের পক্ষ থেকে (কোরবানি করা যায়)।’ (আবু দাউদ, তিরমিজি, বায়হাকি, ইবনে হিব্বান, ইবনে খুযাইমা)

১৫. কোরবানির পশুকে কষ্ট না দেওয়া
জবাই করার সময় অহেতুক কোরবানির পশুকে কষ্ট না দিয়ে সুন্দরভাবে জবেহ করার কথা বলেছেন বিশ্বনবী। হাদিসে এসেছে-
হজরত শাদ্দাদ ইবনে আওছ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা সব কিছুর উপর অনুগ্রহকে অপরিহার্য করেছেন। অতএব যখন তোমরা হত্যা করবে তো উত্তম পদ্ধতিতে হত্যা কর। যখন জবেহ করবে তো উত্তম পদ্ধতিতে জবেহ কর। প্রত্যেকে তার ছুরিতে শান দেবে এবং তার পশুকে শান্তি দেবে।’ (মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)

১৬. কোরবানির পশুরু গোশত
কোরবানির পশুরু গোশত কতদিন রেখে খাওয়া যাবে। এ সম্পর্কে হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে-
হজরত জাবির (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) (বিশেষ একটি কারণে) তিন রাত পর কোরবানির গোশত খেতে নিষেধ করেছিলেন। এরপর (অবকাশ দিয়ে) বলেন, ‘খাও, পাথেয় হিসাবে সঙ্গে নাও এবং সংরক্ষণ করে রাখ।’ (মুসলিম)

হজরত আয়েশা (রা.) র এক বর্ণনায় আছে- فَكُلُوا وَادّخِرُوا وَتَصَدّقُوا. ‘খাও, সংরক্ষণ কর এবং সাদকা কর।’ (মুসলিম)

তবে কোরবানির পশুর গোশত-চামড়া বিক্রি করা বা পারিশ্রমিক হিসেবে কসাইকে দেওয়া যাবে না। কেননা এটা গরিবের হক। হাদিসে এসেছে-
হজরত আলি ইবনে আবি তালিব (রা.)  বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে তার (কোরবানির উটের) আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করতে বলেছিলেন। তিনি কোরবানির পশুর গোশত, চামড়া ও আচ্ছাদনের কাপড় সাদকা করতে আদেশ করেন এবং এর কোনো অংশ কসাইকে দিতে নিষেধ করেন। তিনি বলেছেন, আমরা তাকে (তার পারিশ্রমিক) নিজেদের পক্ষ থেকে দেব।’ (মুসলিম, বুখারি)

১৭. কোরবানির না করা সম্পর্কে সতর্কতা…
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না করলে তার ব্যাপারে প্রিয় নবী রাসূল (সা.) সতর্ক করেছেন এভাবে-
مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ، وَلَمْ يُضَحِّ، فَلَا يَقْربَنّ مُصَلّانَا
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ (ইবনে মাজাহ, দারাকুতনি)

আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে কোরবানির সম্পর্কে বিশ্বনবী রাসূলুল্লাহ (সা.) এর উল্লেখিত হাদিসগুলোর ওপর যথাযথ আমল করার তাওফিক দান করুন। কোরবানির মাধ্যমে সুন্নাহ বাস্তবায়ন ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা