• মঙ্গলবার   ০৫ জুলাই ২০২২ ||

  • আষাঢ় ২০ ১৪২৯

  • || ০৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৩

গাইবান্ধার ভরতখালী মন্দিরে ঐতিহ্যবাহী মনোবাসনা মেলা

দৈনিক গাইবান্ধা

প্রকাশিত: ১৮ এপ্রিল ২০২২  

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী নামকরা তীর্থস্থান ভরতখালী কাষ্ঠ কালি মন্দির। এখানে বৈশাখ মাস জুড়ে চলবে মাসব্যাপী মনোবাসনা পূরনের মেলা। প্রতিবারের মতো এবারও শুরু হয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মাসব্যাপী মনোবাসনা পূরণের মেলা। বিগত দুই বছর বৈশাখ মাসে পুজা হলেও করনা মহামারীর কারনে উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়নি এই মেলা। করনা মহামারী স্বাভাবিক হওয়ায় আবারো জমে উঠেছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মাসব্যাপী মনোবাসনা পূরণের মেলা ও পুণ্যার্থীদের আগমন। করনা কমে যাওয়ায় নতুন করে আবারও মেলা বসায় আনন্দিত হচ্ছে ভক্তবৃন্দ নারী ও পুরুষরা। শনিবার সরেজমিনে কাষ্ঠকালি মন্দিরে গেলে মনোবাসনা পূরনে পুণ্যার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ে।

অন্যদিকে- উক্ত মন্দিরের সরকারি রেকর্ডভুক্ত দেবোত্তর সম্পত্তিটি সরকার খাস করে নেয়ার কারনে আদালতে মামলা চলমান থাকায় মন্দিরের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটছে। এতে করে মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তির মামলা থেকে উদ্ধার ও হয়রানী থেকে মুক্তি পেতে মন্দির কর্তৃপক্ষ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সু দৃষ্টি কামনা করেছেন।

প্রকাশ, প্রতি বছর বৈশাখ মাসের প্রথম শনিবার ও মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়ে বৈশাখ মাসের প্রতি শনি ও মঙ্গলবার ব্যাপী চলে ঐতিহ্যবাহী এই মেলা। সনাতন ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস পূজা অর্চনা ও বলি দান করলে মনোবাসনা পূরণ হয়। ভরতখালী কাষ্ঠকালি মন্দির এ অঞ্চলের হিন্দু ধর্মালম্বীদের তীর্থস্থান। এমনটি মন্তব্য ব্যাক্ত করেন ভরতখালী তীর্থস্থানে আসা পুণ্যার্থীরা।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রায় দুইশত বছর পূর্বে এ মন্দির নির্মিত হয়েছিল। তবে এই মন্দিরকে ঘিরে অলৌকিক একটি ঘটনা হচ্ছে সাঘাটার ভরতখালির যমুনা নদী থেকে ভেসে একটি পোড়া কাঠ থেকে এই মন্দির সৃষ্টি হয়েছে। তৎকালীন জমিদার রমনী কান্ত রায় শ্রী শ্রী কাষ্ঠকালি দেবতাকে স্বপ্নাদেশ পান যে, আমি তো ঘাটে এসেছি, তুই আমাকে পূজা দে। রাজা এই পোড়া কাঠের টুকরোটিকে পূজা দিলে এখান থেকেই এটি কালী মূর্তিতে রূপান্তরিত হয়। তখন থেকে প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শনি ও মঙ্গলবার নিয়মিত পূজা অর্চনা হয়ে আসছে।

গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুণ্যার্থীদের পাশাপাশি মেলায় হাজারো দর্শনাথীদের প্রচুর ভীড়। অনেক দূর দূরান্ত থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ মন্দিরে মানত নিয়ে এসেছে মনোবাসনা পূরণের আশায়। মন্দিরে ধূপ, মোমবাতি, আগরবাতি জালিয়ে ও তেল দিয়ে তারা মায়ের (ঈশ্বর) কাছে প্রার্থণা করছে। মন্দিরের চারপাশে অনেককেই পাঠা (ছাগল) নিয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মনোবাসনা পূরণের লক্ষে প্রার্থনা শেষে মন্দিরের গুরুর (ঠাকুর) নির্দেশ মোতাবেক প্রায় ৫০ থেকে শতাধিক জোড়া পাঠা (ছাগল) বলি দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও প্রার্থনা শেষে অনেকেই আবার বিভিন্ন খাবার ও মিষ্টি বিতরণ করছে।

এ উপলক্ষে মন্দিরের পাশে পাকুর তলায় প্রায় ৭ একর এলাকা জুড়ে বসেছে গ্রামীণ মেলা। উত্তর ও দক্ষিনাঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ মনোবাসনা পুরনে ও ঘুরতে আসেন এখানে। মেলায় বাহারি খাবার, বাঁশের তৈরী কুলা, ডালি, চালন, মাটির তৈরি হাড়ি, থালা, বিভিন্ন মূর্তি, পুতুল, বাঘ, আম এবং নানা তৈজসপত্রের পসরা সাজিয়ে বসে আছে দোকানিরা।

” গাইবান্ধা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষক মিতালী গুন” জানান- ভরতখালি কাষ্ঠকালি মন্দির উত্তরাঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী মন্দির। এখানে গাইবান্ধার বিভিন্ন উপজেলা সহ অন্যান্য জেলার মানুষ মন্দিরে পুজা দিতে ও মনোবাসনা পূরনে আসে। আমি প্রতিবছরই আসি এই মন্দিরে পুজা দিতে। তবে গত দুই বছর করনা মহামারীর সময়ও এসেছি পুজা দিতে তখন মেলা বসেনি।

বগুড়া হতে আসা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কর্মকর্তা মিঠুন কুমার দাস তার সহধর্মিণী নিয়ে এসেছেন মনোবাসনা পূরনে। তিনি জানান- আমরা এই তীর্থস্থানে মাকে পুজা দিতে এসেছি মনোবাসনা পুরনে। আমি ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছি একটা জাগ্রত তীর্থস্থান। গত দুই বছর করনা মহামারী থাকায় আসতে পারনি। করনা মহামারী সিথিল হওয়ায় আসতে পেরে আনন্দিত হচ্ছি। আমাদের প্রতিবেশীদের মাধ্যমে শুনেছি এই মন্দিরে তারা মনোবাসনা পূরনে যে মানত করেছে তা পূর্ণ হয়েছে।

“কাষ্ঠকালি মন্দির এর সাধারন সম্পাদক অশোক কুমার সিনহা” বলেন, এই মন্দিরে আমি দীর্ঘ ৪৬ বছর যাবত সাধারন সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। গত দুই বছর করনা মহামারীর কারনে পুজা হলেও মেলা বসেনি। আশাকরি এ বছর সুষ্ঠ ও সুন্দরভাবে এই মেলা চলবে ও আরোও ভক্তবৃন্দের পদচারণা পড়বে।

তিনি আরও বলেন- এটা একটি পুরাতন ঐতিহ্যবাহী জাগ্রত মন্দির। উক্ত মন্দিরের জায়গাটি সরকারি রেকর্ডভুক্ত দেবোত্তর সম্পত্তি। বাংলাদেশ সরকার তা খাস করে নেয়। এ নিয়ে হাইকোর্টে মামলা মোকদ্দমা করে রায় পেলেও তা অন্যায় ও অবৈধভাবে আটকে রেখেছে। আমরা যেন মঞ্জুর বোর্ডের কাছে জায়গার মামলা থেকে রোধ পাই সে জন্য তিনি প্রশাসন সহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সু-দৃষ্টি কামনা করছি।

উল্লেখ্য, মন্দিরে মানত দিতে আসা হাজারো মানুষের নিরাপত্তায় তৎপর রয়েছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সবদিক দিয়ে মেলার সার্বিক আইন শৃঙ্খলা মোটামুটি ভালো।

দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা