• মঙ্গলবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||

  • আশ্বিন ১২ ১৪২৮

  • || ১৯ সফর ১৪৪৩

গাইবান্ধার চরাঞ্চলে বারি জাতের ফসল চাষে ভাগ্য বদলাচ্ছে চাষিদের

দৈনিক গাইবান্ধা

প্রকাশিত: ১৯ মে ২০২১  

গাইবান্ধার ছয় উপজেলার নদী বেষ্টিত চর এলাকায় কয়েক হাজার বিঘা জমিতে আধুনিক প্রযুক্তি সরবরাহ, বেশি ফলন হয় এমন ফসলের বীজ, চারা, সার বিনামূল্যে প্রদান ও চাষাবাদে তদারকির মাধ্যমে চরাঞ্চলের চাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে। আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে তাদের পরিবারে। উদ্যানতাত্বিক ফসলের গবেষণা জোরদারকরণ ও চর এলাকায় উদ্যান এবং মাঠ ফসলের প্রযুক্তি বিস্তার প্রকল্পের অর্থায়নে এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনিষ্টিটিউট সরেজমিন গবেষণা বিভাগ গাইবান্ধা অফিসের বাস্তবায়নে প্রকল্পের সুবিধাভোগী কৃষকরা এমনটাই জানিয়েছেন।
 
সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া চরের কৃষক এরশাদ জানালেন, কৃষি গবেষণা ইনিষ্টিটিউট দূর্গম চরের বালু মাটিতেও ফসল ফলানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তারা আমাদের পতিত জমিতে চাষাবাদের পরামর্শসহ উন্নতজাতের বিভিন্ন ফসলের বীজ দিয়ে থাকেন। তাদের পরামর্শ মতে আমি মিষ্টি কুমড়া চাষ করে লাভবান হয়েছি। প্রতি বিঘা জমিতে ৩ হাজারের বেশি মিষ্টি কুমড়া হয়েছে। প্রতি পিছ ২০ টাকা করে বেচলেও ৬০ হাজার টাকা বিক্রি করতে পারবো। চরে আরো অনেকে মিষ্টি কুমড়া চাষ করে লাভের মুখ দেখছে।
 
কানাইপাড়া চরের আতাউর আকন্দ ও চর হলদিয়ার আবু ছাঈদ নামের তরুণ যুবক কৃষকরা জানালেন, চরে আগে তেমন কোন ফসল হতোনা। এখন ধান, পাট, মরিচ, ভুট্টা, গম, মিষ্টি আলুু, সরিষা, পেয়াজ, মসুরকালাইসহ বিভিন্ন ফসল হচ্ছে। ফলনও হচ্ছে ভালো। এতে করে সংসারে কষ্ট কমতে শুরু করেছে। আয় হচ্ছে বাড়ছে পরিবারে। তারা নআরো বলেন, বন্যাকালীন সময়ে তেমন ফসল চাষাবাদ করতে না পারলেও বন্যা পরবর্তী সময়ে চরে সবধরণের ফসল হয়। জীবন নির্বাহের জন্য এখন ঢাকা বা অন্য কোনো জেলায় কাজ করতে যেতে হয় না। নিজেদের চরের জমি চাষাবাদ করেই সময় পাইনা। আগের মতো চরের মানুষের আর অভাব নেই, ফসল থেকে এখন বেশ ভালো আয় করতে পারছে অনেকেই।
 
হলদিয়া চরের কৃষক আমির আলী জানালেন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনিষ্টিটিউট সরেজমিন গবেষণা বিভাগ গাইবান্ধা অফিসের সহযোগিতায় আমাদের বিনামুল্য বিভিন্ন ধরনের বীজ ও পরামর্শ প্রদানের ফলে এখন একই জমিতে ফসল ভালো হচ্ছে। এতে করে চরের কৃষকরা খরচ বাদে ভালো আয় করছি। উন্নতমানের বীজ ও চাষাবাদে পরামর্শ অব্যাহত থাকলে অল্পদিনেই কৃষকরা ঘুরে দাড়াবে।
 
গাইবান্ধার সাঘাটা-ফুলছড়ি উপজেলায় যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদের বুক চিরে জেগে ওঠা বেশ কিছু বালুচরে দোঁ-আশ ও পলি মাটির স্তর পড়ার কারণে বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করে কৃষিবিপ্লব ঘটাচ্ছেন চরবাসি। নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত ও বন্যার পরে চরের মানুষ সদ্য জেগে উঠা চরে বারি হাইব্রিড মরিচ, বেগুন, পিঁয়াজ, ধনিয়া, রসুন, টমেটো, গাজর, গম, চিনা, ভুট্টা, কাউন, চিনাবাদাম, মিষ্টিআলু, মশুর ডাল, তিল, তিষি, কালোজিরা, সুর্যমুখী, গাঞ্জিয়া ধান, বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল ফলিয়ে এখন ঘুরে দাড়াতে শুরু করেছে। অনাবাদি বালুচরে মিষ্টি কুমড়া চাষ, ঘরের চালে মিষ্টি কুমড়া, লাউ, সিম, করলা লাগিয়েছে অনেকেই। বিস্তীর্ণ বালুচরে এখন ফসলের সমারোহ। উৎপাদিত ফসল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে কৃষকরা দিনদিন নিজেদের ভাগ্য বদলাচ্ছে। কাঁচা মরিচের দাম কম হওয়ায় অনেকে ক্ষেতেই তা পাকানোর পর এখন ঘরের চালে-উঠানে রোদে দিয়ে শুকিয়েছে।
 
ওইসব চরে দেশী ও হাইব্রিড জাতের মরিচের চাষ বেশি হয়, এবার গাইবান্ধার চরাঞ্চলে এক হাজার হেক্টর জমিতে দেশি ও হাইব্রিড জাতের মরিচ চাষ হয়েছে। প্রতিবিঘা জমিতে ৫০ থেকে ৭০ মন মরিচ উৎপাদন হয়েছে। জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে চরের কৃষকের মরিচ। চরাঞ্চলের ৪ শত হেক্টর জমিতে ভুট্টা, ৫শ হেক্টর জমিতে গম চাষ হয়ে থাকে। চরাঞ্চলের ১৪ হাজার বিঘা জমিতে ফসল ফলিয়েছেন কৃষকরা।
 
সাঘাটা উপজেলার গাড়ামারা, কানাইপাড়া, নলছিয়া, গোবিন্দপুর, বেড়া, পাতিলবাড়ি, উত্তর দীঘলকান্দি, দক্ষিণ দীঘলকান্দি, হলদিয়া, কালুরপাড়া, কুমারপাড়া, গুয়াবাড়ি, গোবিন্দী, বাশহাটা, বুগারপটল ও চিনিরপটল ফুলছড়ি উপজেলার বাগবাড়ি, দেলুয়াবাড়ি, টেংরাকান্দি, খোলাবাড়িসহ কমপক্ষে ২০টিঁ চরেও বারি জাতের বীজের ফসল হয়েছে। ফলন হয়েছে ভালো। একসময়ের ¯্রােতসীনি যমুনা শুকিয়ে জেগে ওঠা বালুচর এখন কৃষকরে শস্য ভান্ডার নামে পরিচিতি পেয়েছে।
 
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনিষ্টিটিউট সরেজমিন গবেষণাবিভাগ গাইবান্ধা অফিসের সাঘাটা উপজেলার দায়িত্বে থাকা সহকারি বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ হারুন অর রশিদ সুর্যমূখী চাষ সর্ম্পকে বললেন, সূর্যমূখী বীজ থেকে যে তেল হবে তা হবে কোলেষ্টেরোল মুক্ত। তারা চরের কৃষকদের পতিত জমিতেই বারি জাতের এই ফুলের চাষ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। ফলন ভালো হয়েছে। তিনি বারি কাউন চাষ সর্ম্পকে বললেন, কৃষক চরের জমিতে এবার যে পরিমান কাউন বুনেছে তাতে ভালো ফলন হয়েছে। বিঘায় ১০-১২ মন পর্যন্ত উৎপাদন হবে। সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগ শুরু করেছে। চরাঞ্চলগুলোতেও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত জাতের বীজের মাধ্যমে চাষাবাদ শুরু করা হয়েছে। ফলে কৃষকের চাষাবাদের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি সম্প্রসারিত হচ্ছে। শস্য উৎপাদনও বাড়ছে।’
 
হলদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান ইয়াকুল আলী জানান, চরের এক সময়ের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো নানা ধরণের ফসল ফলিয়ে এখন অনেকটাই স্বাবলম্বী। একসময় নদী ভাঙ্গন ও বন্যার কারণে এই অঞ্চলের মানুষ ছিল অতিদরিদ্র, তখন এই অঞ্চলকে মঙ্গাপীড়িত অঞ্চল বলা হতো। সেসময় অভাবী পরিবারের পুরুষরা ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরে গিয়ে শ্রমিকের কাজ করেতো। অনেকেই নদী থেকে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাতো। আর নারীরা নদী থেকে ভেসে আসা কাঠ সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে কোনো রকমে জীবিকা নির্বাহ করতো। সেই নদীর বুকে জেগে ওঠা বালুচরকে কাজে লাগিয়ে অভাব-অনটন দূর করে সেইসব লোকগুলো এখন ভাগ্য বদলাতে শুরু করেছেন। এসব পরিবারের নারীরা এখন তাদের স্বামী-সন্তান নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে ফসল ফলাচ্ছেন। এইসব চরের কৃষকদের জন্য সরকারীভাবে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা হলে পরিত্যক্ত চর সম্ভাবনাময় অঞ্চলে পরিনত হবে। তিনি বলেন চরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য শস্যমাড়াই ও শস্য সংরক্ষণের জন্য সরকারীভাবে সেড ঘরের ব্যবস্থা করা হলে কৃষকের পক্ষে তাদের উৎপাদিত ফসল নিরাপদে ঘরে তোলা সহজ হতো।
দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা