মঙ্গলবার   ০৫ মার্চ ২০২৪ || ২১ ফাল্গুন ১৪৩০

প্রকাশিত: ১৪:৪০, ২০ নভেম্বর ২০২৩

অভিনয়শিল্পী থেকে লুৎফর এখন ‘হঠাৎ বাবুর্চি’

অভিনয়শিল্পী থেকে লুৎফর এখন ‘হঠাৎ বাবুর্চি’
সংগৃহীত

পরনে রংচটা পোশাক, মাথায় মুকুট। সঙ্গে ব্যতিক্রম বাইসাইকেল। তবে হেডলাইটে চোখ পড়লে মনে হবে এ যেন মোটরসাইকেল। লাগানো আছে মোটরসাইকেলের মতো হর্ন। পেছনে বাধা রয়েছে রান্না করার উপকরণ। বাইসাইকেলের সামনে লাগানো হেডলাইটে লেখা পুলিশ, তার উপরে রয়েছে রাইফেল হাতে থাকা পুলিশের ডামি পুতুল। হঠাৎ দেখলেই যে কারো নজর কাড়ব। ব্যতিক্রমী এই বাইসাইকেলের মালিকের নাম লুৎফর রহমান। পেশায় তিনি বাবুর্চি।

৭৫ বছর বয়সেও সঙ সেজে মানুষকে বিনোদন দিতে ভালোবাসেন তিনি। শখের বাইসাইকেল নিয়ে প্রতিদিন ছুটে চলেন। তার বাইসাইকেলে লাগানো আছে সাউন্ডবক্স আর নৌকার প্রকৃতি ও চার্জার লাইট। গানে জ্ঞানে আর রান্নাবান্নার ধ্যানে বিভিন্ন এলাকায় ছুটে বেড়ান তিনি। তার নাম লুৎফর রহমান হলেও সবার কাছে তিনি পরিচিত ‘হঠাৎ বাবুর্চি’ নামে।

লুৎফর রহমানের বাড়ি রংপুর মহানগরীর তপোধন চওড়ারহাট এলাকায়। চার মেয়ের সবাইকে বিয়ে দিয়েছেন। এক ছেলে সেও বিয়ে করে থাকেন বাবা-মাকে ছাড়া। বৃদ্ধ লুৎফর এখন তার অসুস্থ স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ধরেছেন সংসারের হাল। জীবন সায়াহ্নে এসে অভিনয়ে ডুবে থাকতে নজরকাড়া সাজে নিজের কষ্ট ভুলে অন্যকে হাসাতে চান লুৎফর। তাই পুরোদস্তুর বাবুর্চি হয়েও ফেলে আসা মঞ্চনাটকের একটি চরিত্রে নিজেকে খুঁজে বেড়ান তিনি।

সম্প্রতি লুৎফর রহমানের সঙ্গে নগরীর ময়নাকুঠি এলাকার দেখা হয়। তিনি ওই এলাকায় এক বিয়ের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। সেখান থেকে কাজ শেষে বাইসাইকেলে চালিয়ে ছুটে যাচ্ছিলেন আপন ঠিকানায়। পথিমধ্যে বাইসাইকেল থামিয়ে কিছুক্ষণের আলাপচারিতায় শোনালেন তার জীবন গল্প। সুখ-দুঃখ, হাসিকান্না সবই তার কাছে জীবনের একেকটি সময়ের অংশ। এখন তিনি সুখ-দুঃখের হিসেব কষেন না, এখন শুধু স্ত্রীকে নিয়ে একটু ভালোভাবে বাঁচতে চান।

রঙচটা পোশাক পরিধান প্রসঙ্গে জানতে চাইলে লুৎফর রহমান জানালেন, তরুণ বয়সে তিনি গ্রামের মঞ্চনাটকে অভিনয় করতেন। একটি নাটকে তার চরিত্রের নাম ছিল ‘হঠাৎ’। অভিনয় ভালো করতে পারায় লোকমুখে ছড়িয়ে যায় ‘হঠাৎ‌’ নামটি। পরে অবশ্য নাটকের মঞ্চ ছেড়ে জড়িয়ে পড়েন বাবুর্চি পেশায়। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এ পেশাতেই আছেন।

বাবুর্চি পেশার আগে লুৎফর রহমান ছিলেন কৃষিশ্রমিক। কিন্তু সেই কাজে তার মন বসত না। রান্নার প্রতি এক ধরনের ঝোঁক ছিল তার। তাই মাঝেমধ্যে প্রতিবেশীদের বাড়িতে ছোটখাটো অনুষ্ঠানে রান্নার ফরমায়েশ নিতেন। ধীরে ধীরে লুৎফরের রান্নার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামে।

লুৎফর রহমানের শখ ছিল পুরোনো বাইসাইকেল বাদ দিয়ে একটি মোটরসাইকেল কিনবেন। কিন্তু সাধ আছে কিন্তু সাধ্য নেই। তাই বাইসাইকেলেই লাগিয়েছেন হেডলাইট ও হর্ন। মোটরসাইকেল মেরামতের দোকান থেকে লুৎফর এসব যন্ত্রপাতি কিনেছিলেন। সব মিলিয়ে খরচ পড়েছে দেড় হাজার টাকা। আশপাশের লোকজনও বেশ আগ্রহ নিয়ে তার ব্যতিক্রম বাইসাইকেলটি দেখতে আসেন। মানুষজন তাকে দেখলেই বলেন, ‘ওই দেখো, হঠাৎ বাবুর্চি যায়।’

বাবুর্চি পেশায় যা রোজগার হয় তাতেই খুশি লুৎফর রহমান। এভাবেই বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে চান তিনি। সময়ে-অসময়ে রাজকীয় সাজসজ্জা নিয়ে বের হওয়ার গল্প বলতে গিয়ে খানিকটা চুপ থাকেন। এরপর হাসতে হাসতে বলেন, অনেক রাজা-বাদশা তো ফকিরও হয়ে গেছে। এটাই ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। আমি রাজা নই বাদশাহ নই আমি লুৎফর রহমান। আগে ছিলাম অভিনেতা আর এখন বাবুর্চি আমার পেশা। প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা আয়, এটা দিয়ে সংসার ভালোই কেটে যায়। নিজের কাজ নিজেই করে যাচ্ছি।

অনুষ্ঠান যাই হোক রান্নার কাজ করে পারিশ্রমিক নিয়ে থাকে না তার কোনো দাবি দাওয়া। কাজ শেষে যা পান তাতেই খুশি হয়ে বাড়ি ফেরেন হঠাৎ বাবুর্চি লুৎফর। এতে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার ভালোই কেটে যায়। এভাবে গ্রামবাসীকে সেবা আর বিনোদন দিয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে চান হঠাৎ বাবুর্চি ওরফে লুৎফর রহমান।

তিনি আরও জানান, তার বাইসাইকেলের পেছনে বেশির ভাগ সময় রান্নার উপকরণ বাধা থাকে। রান্নার ডাক এলেই বাইসাইকেলে করে রওনা দেন তিনি। মোবাইল সিম আছে, কিন্তু মোবাইল নষ্টের কারণে কারও সঙ্গে কথা বলতে পারেন না। রান্নার কাজে চওড়া বাজারে দেখা করতে হয় হঠাৎ বাবুর্চির সঙ্গে। কাচ্চি বিরিয়ানি, ফিরনি, পোলাও, কোরমাসহ বাংলা খাবারের সব আইটেম রান্না করতে পারেন তিনি।

এই প্রতিবেদককে লুৎফর রহমান জানান, না চাইলেও রান্না করা খাবার মেলে। কারও কাছে তাকে খাবারের জন্য হাত পাততে হয় না। বৃদ্ধ বয়সে তিনি অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে আছেন। ছেলেমেয়েরা আলাদা থাকলেও তারাও ভালো আছে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনই বয়সের ভারে এখন কিছুটা অসুস্থ হলেও মনোবলের দিক থেকে সুস্থ। এই জীবনে মানুষজনের অনেক ভালোবাসা পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধেও অবদান রয়েছে লুৎফর রহমানের। সেসময় মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার সংগ্রহ করে খাওয়াতেন তিনি। আবার কখনো নিজেও রান্না করে খাওয়াতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-যত্ন করতেন তিনি। কিন্তু সেই কাজের স্বীকৃতি মিলেনি তার ভাগ্যে। তিনি ভালোবাসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। নৌকা তার পছন্দের প্রতীক। এ কারণে বাইসাইকেলে তিনি নৌকাকেও রেখেছেন। তবে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেও স্বীকৃতি না পাওয়া নিয়ে তার কোনো অভিমান কিংবা আক্ষেপ নেই। বরং নিজের ভাগ্যকেই দুষছেন পরিশ্রমী লুৎফর রহমান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রংপুর সিটি করপোরেশনের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের তপোধন চওড়ারহাট বাজারে ছোট্ট একটি খুপরি ঘরে থাকেন লুৎফর রহমান। সেখানে তার একটি হোটেল থাকলেও অর্থাভাবে সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। এখন তিনি সেই হোটেলেই থাকেন। অসুস্থ স্ত্রী কখনো তার সঙ্গে নয়তো কখনো বাবার বাড়িতে থাকেন। গ্রামের সবার কাছে বৃদ্ধ লুৎফর রহমান ‘হঠাৎ বাবুর্চি’ নামেই বেশি পরিচিত। সেই কথাই বলছিলেন ওই গ্রামের যুবক নুরুজ্জামান নির্যাস।

এই প্রতিবেদককে নির্যাস বলেন, আমাদের গ্রামের সবাই তাকে ‘হঠাৎ বাবুর্চি’ নামেই চেনেন। তার আসল নাম অধিকাংশ মানুষই বলতে পারবেন না। তার ওপর তিনি বাইসাইকেলটি বানিয়েছেন মোটরসাইকেলের আদলে, এটাও তার কাজের ভিন্নতা। এই বয়সেও তিনি তার নিজে কর্ম করে যাচ্ছেন। মানুষকে বিনোদন দেওয়ার পাশাপাশি তিনি নিজেও সব সময় আনন্দে থাকার চেষ্টা করেন।

সৈয়দপুরে এক বিহারি বাবুর্চির কাছে রান্নার কাজ শেখেন লুৎফর রহমান। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই কাজের সঙ্গে আছেন। একসঙ্গে ১২০০ থেকে ১৫০০ জনের রান্না করতে পারেন তিনি। আগের চেয়ে এখন চাহিদা বেশি ‘হঠাৎ বাবুর্চির’।

মিলন মিয়া নামে স্থানীয় এক দিনমজুর বলেন, ‘হঠাৎ বাবুর্চি’ চাচার হাতের রান্নার স্বাদই আলাদা। তার হাতের রান্নার সুনাম পুরো গ্রামজুড়ে রয়েছে। এজন্য প্রায়ই গ্রামের বাইরেও তার রান্নার জন্য ডাক পড়ে। আমরা তাকে সবসময় কাছে পাই। তিনি আমাদেরকে শুধু বিনোদনই দেন না। দেশের জন্য ভালো ভালো কাজ করার পরামর্শও দেন। শুনেছি তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়ও মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছিল। এখন তাকে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা উচিত।

রংপুর সিটি করপোরেশনের ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনোয়ারুল ইসলাম জানান, বাবুর্চি লুৎফর রহমান বয়স্ক যাতে পান সেজন্য ব্যবস্থা করা হবে। আমি এ ব্যাপারে মেয়রের সঙ্গে কথাও বলেছি। তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে পেলে একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

সূত্র: ঢাকা পোস্ট

সর্বশেষ

জনপ্রিয়