মঙ্গলবার   ০৫ মার্চ ২০২৪ || ২১ ফাল্গুন ১৪৩০

প্রকাশিত: ০৬:৪১, ৯ নভেম্বর ২০২৩

হয়তো স্মৃতির জাদুঘরেই ঠাঁই হবে ট্রামের

হয়তো স্মৃতির জাদুঘরেই ঠাঁই হবে ট্রামের

জীবনানন্দ দাশের সেই লাইনটির কথা মনে আছে? ‘‘শেষ ট্রাম মুছে গেছে, শেষ শব্দ, কলকাতা এখন...” জীবনানন্দ দাশের লেখাটা ছিল মহানগরের বুকে নিছকই গভীর রাতের এক দৃশ্য। কিন্তু সত্যিই বুঝি কলকাতা থেকে মুছে যেতে বসেছে ‘শেষ’ ট্রাম। দেড়শ’ বছরে পা দেওয়া আশ্চর্য যানটি আজ এক অদৃশ্য কুয়াশার ভেতরে ঢুকে পড়েছে।

কিছুদিন পর তাকে দেখতে হলে বুঝি ছবি আর মিউজিয়ামই ভরসা হয়ে দাঁড়াবে। যদিও একথা সেই অর্থে এখনও বলা যায় না। তবু… ২০১১ সালে ৩৭টি রুটে ট্রাম চলত। আজ সেখানে মাত্র দুটি। ধর্মতলা-গড়িয়াহাট ও বালিগঞ্জ-টালিগঞ্জ। এই দিকে তাকালে কি মনে হয় না অবলুপ্তির পথেই যেতে বসেছে ট্রাম? মনে পাক খায় প্রশ্ন, আর কতদিন?

ট্রামের দেড়শ’ বছর উপলক্ষে শুরু হয়ে গিয়েছে ঝলমলে উৎসব। শহরজুড়ে চলছে উদ্‌যাপন। তবু এরই মধ্যে রয়ে গেছে আবেগে থরথর দাবি। ট্রাম যেন হারিয়ে না যায়। সেই সব আন্দোলনের মাঝে তাই দ্বিধার কাঁটাকে নির্মূল বলা যাচ্ছে না মোটেই। তাই সংশয় রয়েই গেছে। কিন্তু এত দাবি সত্ত্বেও সত্যিই কি বাঁচানো যাবে ট্রামকে?

গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম ছিল আমজনতার ভরসার এক অন্যতম যান। অথচ শুরুর দিকে সেই আঁচ মোটেও মেলেনি। ১৮৭৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যেদিন শহরের পথে প্রথম ছুটতে শুরু করল দুই বগির গাড়িটি, কে আর ভেবেছিল কয়েক দশকের মধ্যে ট্রাম কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে! ঘোড়ায় টানা ট্রাম সেদিন ছুটেছিল শিয়ালদহ থেকে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত। ভায়া বউবাজার স্ট্রিট, ডালহৌসি স্কোয়ার ও স্ট্র্যান্ড রোড। সবসুদ্ধ ৩.৯ কিলোমিটারের যাত্রাপথ। তাতেই তৈরি হল ইতিহাস। তবে সেই সময় কেবলই মাল পরিবহণ। কিন্তু কয়েক মাস ঘুরতে না ঘুরতে থমকে গিয়েছিল পরিষেবা। ১৮৭৩ সালের ২০ নভেম্বর বন্ধ করে দেওয়া হল ট্রাম চলাচল। নতুন করে ফের ট্রাম পরিষেবা শুরু হল বছর সাতেক বাদে। সেটা ১৮৮০ সাল, ২২ ডিসেম্বর। সেই বছরই স্থাপিত হয়েছিল ক্যালকাটা ট্রামওয়ে কোম্পানি। নয়া উদ্যমে ছুটতে শুরু করল ট্রাম। ছুটতে ছুটতে এতগুলো বছর পেরিয়ে এসেছে সে।

প্রথমে কেবলই ঘোড়ায় টানা ট্রাম। এ কাজে দারুণ পটু ছিল অস্ট্রেলিয়ার ঘোড়া। এরপর অল্প সময় নাকি স্টিম ইঞ্জিনে চালিত ট্রামও চালানো হয়েছিল। অবশেষে ১৯০০ সালে এল ইলেকট্রিক ট্রাম। সেই ট্রামের প্রথম রুট এসপ্ল্যানেড-খিদিরপুর। তারপর একে একে নতুন নতুন রুট। সব ট্রামই হয়ে গেল ইলেকট্রিক। নিত্যযাত্রীদের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হতে থাকে ট্রাম।

সাতের দশকে এসে তা দাঁড়াল ৫২টি রুটে। অথচ ট্রামের অস্তিত্ব সংকট কিন্তু আজকের নয়। ১৯৩৩ সালে কানপুরের ট্রাম পরিষেবা বন্ধ হয়ে গেল। একে একে চেন্নাই, দিল্লি ও মুম্বইয়েও বন্ধ হয়ে যায় ট্রাম চলাচল। কিন্তু আশ্চর্যের কথা হল ট্রাম কিন্তু বন্ধ হয়নি কলকাতায়। আসলে ততদিনে এই শহরের সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে মিশে গিয়েছে এই যান। একেবারে অপ্রতিরোধ্য হয়ে।

সেই সময়ের সাহিত্য-সিনেমায় কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে ট্রাম, সেদিকে লক্ষ রাখলেই ব্যাপারটা বুঝে ফেলা যায়। রবীন্দ্রনাথের কলমে আঁকা রয়েছে ট্রামের কন্ডাকটরের ছবি- ”ট্রাম-কন্ডাকটর,/ হুইসেলে ফুঁক দিয়ে শহরের বুক দিয়ে/ বারো-আনা বাকি তার মাথাটার তেলো যে,/ চিরুনির চালাচালি শেষ হয়ে এল যে।” আবার ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতায় রয়েছে ”নাম তার কমলা/ দেখেছি তার খাতার উপরে লেখা।/ সে চলেছিল ট্রামে, তার ভাইকে নিয়ে কলেজের রাস্তায়।/ আমি ছিলেন পিছনের বেঞ্চিতে।”

আবার সত্যজিতের ‘মহানগর’ ছবি জুড়ে ট্রামের কী অসামান্য প্রয়োগ। ছবির শুরুতেই স্ক্রিনজুড়ে ট্রামের ‘টিকি’। ক্রমে ট্রামের আসনে বসে থাকা অনিল চট্টোপাধ্যায়ের মুখ। শুরু হয় এক মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনের কাহিনি। মধ্যবিত্তরা জীবনকে আঁকতে বসে সেদিন ট্রামকে এভাবেই ব্যবহার করেছিলেন সত্যজিৎ। আবার মৃণাল সেনের ‘ইন্টারভিউ’ ছবিতেও ট্রামের ভিড়ে রঞ্জিত মল্লিককে মনে পড়ে। এমন উদাহরণ অসংখ্য। একসময় কলকাতার ৪৯ মাইলেরও বেশি অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়া ট্রামলাইন বাঙালির দৈনন্দিন বেঁচে থাকার কত গভীরে পৌঁছে গিয়েছিল তা বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। ‘ট্রামে-বাসে বাদুড়ঝোলা’… হরলিক্সের সেই বিখ্যাত বিজ্ঞাপন মনে পড়ে? কিংবা ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র গানে ‘শহরের উষ্ণতম দিনে… পুরোনো মিছিলে পুরোনো ট্রামেদের সারি’?

এবং জীবনানন্দ। তাঁর জীবনের যতিচিহ্ন হয়ে জুড়ে গিয়েছে ট্রাম। একদিন তিনিই ‘একটি নক্ষত্র আসে’ কবিতায় নির্মাণ করেছিলেন রাতের কলকাতার এক অনির্বচনীয় দৃশ্য- ”শেষ ট্রাম মুছে গেছে, শেষ শব্দ,/ কলকাতা এখন/ জীবনের জগতের প্রকৃতির অন্তিম নিশীথ;/ চারিদিকে ঘর বাড়ি পোড়ো-সাঁকো সমাধির ভিড়…।”

তারপর একদিন এক উদাসী বিকেলে সেই দুর্ঘটনা। ট্রামের ক্যাচারে আটকে গিয়েছিল কবির দেহ। বাড়ি আর ফেরা হয়নি তাঁর। ‘ঘাতক’ ট্রামটিও নাকি পরে পুড়ে গিয়েছিল আগুনে! আজও কবিতামুখী তরুণরা খুঁজে বেড়ান সেই জায়গাটা যেখানে জীবনানন্দের শরীরে আছড়ে পড়েছিল ট্রাম। কেবল কবিতা-চলচ্চিত্রই তো নয়। ছেচল্লিশের দাঙ্গার দগদগে স্মৃতিতেও মিশে রয়েছে ট্রাম শ্রমিকদের প্রতিরোধের কাহিনি। কিংবা এক পয়সা ট্রাম ভাড়া বাড়ানোর অভিযোগে প্রতিবাদ? ট্রাম পুড়িয়ে দেওয়া? রাজনীতির আঁচও কম পোহাতে হয়নি ট্রামকে। শহরের হর্ষ-বিষাদের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে সে।

কিন্তু যত বেশি করে শহরের রাজপথে গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে বাস, তত গুরুত্ব হারাতে থেকেছে ট্রাম। ক্রমে শুরু হল অটোর রাজত্বও। আরও গুরুত্বহীন হয়ে গেল ট্রাম। গত তিন দশকে তার অবস্থান খানিকটা ‘ভিন্টেজ’ গাড়ির মতোই। দৃষ্টিনন্দন, ঐতিহ্যবাহী… কিন্তু গতির সামনে অসহায়। তাছাড়া ট্রামকে যেহেতু নির্দিষ্ট লাইন দিয়ে চলতে হয়, তাই সেই অঞ্চলে অন্য যানবাহনের চলাটা একটু কঠিনই হয়ে যায়। যুক্তি এমন হাজারও রয়েছে। তবুও ট্রাম মুছে যাবে, এটা ভাবতে কার ভালো লাগে?

তবে আশার কথা ‘আলো ক্রমে আসিতেছে’। রাজ্য সরকার জানিয়ে দিয়েছে, ট্রাম তোলার পক্ষপাতী নয় তারাও। রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী আশ্বাসের কথাই শুনিয়েছেন। বলেছেন, হয়তো সব রুটে ট্রাম আর চালানো যাচ্ছে না। কিন্তু সরকারের কোনো উদ্দেশ্যই নেই ট্রাম তুলে দেওয়ার। আর এই নিয়ে সরকার বৈঠকও করছে কলকাতা পুরসভা ও কলকাতা পুলিশের সঙ্গে। ট্রামের দেড়শো বছরের উদ্‌যাপনের সময় এ বড়ই আশার কথা। আপাতত সেই আশাকে সঙ্গে নিয়েই দিনযাপন এই শহরের নস্টালজিয়ায় ভোগা মানুষদের।

সূত্র: ডেইলি-বাংলাদেশ।

দৈনিক গাইবান্ধা

সর্বশেষ

জনপ্রিয়