• সোমবার   ১৫ আগস্ট ২০২২ ||

  • শ্রাবণ ৩১ ১৪২৯

  • || ১৬ মুহররম ১৪৪৪

লাল মাংস ‘পরিমিত’ খাওয়ার পরামর্শ

দৈনিক গাইবান্ধা

প্রকাশিত: ১৩ জুলাই ২০২২  

দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়েছে। ঈদে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে পশু কোরবানি করেছেন। ঈদ পরবর্তী সময়ে এবার পরিবার-স্বজনদের নিয়ে কোরবানির মাংস খাওয়ার উৎসবে মেতেছেন সবাই। এই অবস্থায় ঈদ উৎসবে ‘পরিমিত’ লাল মাংস খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যথায় আনন্দের ঈদ বিষাদেও রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

সাধারণত, গরু, খাসি, মহিষ, ভেড়ার মাংসকে লাল মাংস বা রেড মিট বলা হয়ে থাকে। এসব মাংসে মায়োগ্লোবিন নামক উপাদান বেশি থাকার কারণে মাংস লাল হয়। এই মাংসে উচ্চ মাত্রার চর্বি ও কোলেস্টেরল থাকায় খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা ঝুঁকি থেকে যায়। তাই রোগীদের ক্ষেত্রে খুব সতর্ক হয়ে রেড মিট খাওয়া প্রয়োজন বলে অভিমত তাদের।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার বলেন, আমাদের যেসব কার্ডিয়াক রোগী (হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী) রয়েছেন, বিশেষ করে যাদের হার্টে ব্লক রয়েছে, যাদের বাইপাস সার্জারি করা, ওইসব রোগীদের আমরা সবসময়ই পরামর্শ দেই চর্বি জাতীয় খাবার বর্জন করার। এছাড়াও তাদেরকে আমরা পরামর্শ দেই কোরবানির সময়টাতে তারা যেন সক্রিয় অংশগ্রহণ না করেন। কারণ কোরবানিসহ খুব পরিশ্রমের কাজগুলো তাদের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, একজন সুস্থ মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১০০ গ্রাম লাল মাংস খেতে পারেন। কিন্তু যাদের পাকস্থলীতে আলসার রয়েছে তারা লাল মাংস খেলে তাদের রোগ বাড়িয়ে দেয়। তাদের উচিত হবে প্রোটিনের বিকল্প উৎসের দিকেই অধিক মনোযোগী হওয়া। আর কিডনি ফেইলিউরের রোগীরা প্রতিদিন ৩০ গ্রাম প্রোটিন খেতে পারবেন। আর যারা ডায়ালাইসিস করেন তারা পারবেন ৭০ গ্রাম মাংস খেতে। সাধারণত কিডনি রোগীরা লাল মাংস খাবেন কি না, সেক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নেবেন।

তিনি বলেন, খাবারের ক্ষেত্রে আমরা বলি, যদি আপনার ভালো লাগে বা ধর্মীয় কারণে আপনি মাংস খাবেন। কিন্তু তার মানে এই না যে আজকে ভাত খাব না সব গরুর মাংস খাব, এমনটা যেন না হয়।

‘ঈদের মাংস খেলে কিছু হবে না’- সাধারণ মানুষের এমন ধারণা প্রসঙ্গে প্রদীপ কুমার বলেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন একটি ধারণা বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু আমার যেসব কার্ডিয়াক রোগী রয়েছেন, তাদেরকে আমি বলি, মাংস খেলেও সংযমের সঙ্গে এক-দুই টুকরো খেতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি তাকে বলে দেন যে, ঈদের মাংস খেলে কিছু হবে না, তাহলে তার ভেতরেও একটা বিশ্বাস জমে যাবে যে, না ঈদের মাংস খেলে আসলেই আমার কিছু হবে না। এক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপদ ঘটতে পারে।

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, আমরা চাই একজন হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মন সবসময় যেন গরু, খাসিসহ লাল মাংসের প্রতি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই বাধাটা যদি সবসময় তার মধ্যে থাকে, তাহলে এই ধরনের খাবার তার চোখের সামনে থাকলেও সে খাবে না বা খেতে চাইবে না। আর এটা যদি আপনি ভেঙে দেন, তাহলে সে বিভিন্ন উৎসব আয়োজনেও খাওয়া শুরু করবে। এমনকি এক পর্যায়ে সে নিয়মিত খাওয়া শুরু করবে, যা তার জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

এই বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. একেএম মোশাররফ হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদেরকে খাবার-দাবারের ব্যাপারে অবশ্যই পরিমিতবোধ বজায় রাখতে হবে। কারণ ঈদ উপলক্ষে যে মাংসগুলো খাই, সেগুলোতে প্রচুর পরিমাণ ফ্যাট থাকে। আর এই ফ্যাটগুলো রক্তনালিতে গিয়ে সরাসরি রক্তনালীকে সরু করে দেয়।

তিনি বলেন, আমরা দেখছি যে, এখন মানুষের অল্পবয়সেই হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাচ্ছে। বাচ্চারা অল্পবয়সেই অস্বাভাবিক মোটা (ওবিসিটি) হয়ে যাচ্ছে। এই ওবিসিটি মানুষকে ক্যান্সার পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। এছাড়া ব্রেইন স্ট্রোক, কিডনির ক্ষতি, হার্টের ক্ষতি হয়ে থাকে। এই ফ্যাট এবং স্থুলতা যদি আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তাহলে আমাদেরকে খাওয়া-দাওয়া পরিমিত করতে হবে। আমরা ঈদ উৎসবসহ যেকোনো সময়ে যেই খাবারই খাই, সেগুলোতো ফ্যাট আছে কি না সেটা দেখে খেতে হবে।

খাবার-দাবারে বয়সের কোনো সীমা পরিসীমা আছে কি-না জানতে চাইলে চিকিৎসক বলেন, ফ্যাটযুক্ত খাবার যেকোনো বয়সের জন্যই ক্ষতিকর। তাই আমি এখানে কোনো বয়সের সীমা পরিসীমা রাখব না। এখন কিন্তু ৩০ বছরের মধ্যেই প্রচুর পরিমাণ হার্টের রোগী আমরা দেখতে পাচ্ছি। এমনকি আমাদের এশিয়ান সাবকন্টিনেন্টে ৩০ থেকে ৪০ বছরের এই সময়টা সবচেয়ে ঝুঁকির সময় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এই সময়টাতে হার্ট অ্যাটাক হলে খুব ম্যাসিভ আকারেই হয়ে থাকে, অনেক সময় হাসপাতালে নেওয়ার আগেই রোগী মারা যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, একজন সুস্থ মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১০০ গ্রাম লাল মাংস খেতে পারেন। কিন্তু যাদের পাকস্থলীতে আলসার রয়েছে তারা লাল মাংস খেলে তাদের রোগ বাড়িয়ে দেয়। তাদের উচিত হবে প্রোটিনের বিকল্প উৎসের দিকেই অধিক মনোযোগী হওয়া। আর কিডনি ফেইলিউরের রোগীরা প্রতিদিন ৩০ গ্রাম প্রোটিন খেতে পারবেন। আর যারা ডায়ালাইসিস করেন তারা পারবেন ৭০ গ্রাম মাংস খেতে। সাধারণত কিডনি রোগীরা লাল মাংস খাবেন কি না, সেক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নেবেন।

তবে যাদের অপারেশন হয়েছে বা শরীরে কোনো গভীর ক্ষত আছে, তারা ১০০ গ্রামের বেশি লাল মাংস খেতে পারেন। সেক্ষেত্রে গেঁটে বাতের রোগীরা লাল মাংস খাবেন না। লাল মাংস রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা বাড়িয়ে দেবে। আর যারা হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন বা স্ট্রোকের ঝুঁকিতে আছেন তাদের লাল মাংস এড়িয়ে যাওয়া ভালো। তারা প্রোটিনের জন্য মাছ-মুরগির মাংস খেতে পারেন। আর লিভারের রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লাল মাংস খাবেন।

এসব প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, যে মাংসগুলো খেতে স্বাদ, সেগুলো হলো রেড মিট, আমরা বলি সেটিকে লাল মাংস। আর লাল মাংসে প্রচুর পরিমাণ কোলেস্টেরল আছে, সেজন্য আমরা এগুলো কম খেতে পরামর্শ দিয়ে থাকি। বিশেষ করে গরুর মাংস, মাটনে সর্বোচ্চ মাত্রার কোলেস্টেরল থাকে। এমনকি এ কারণে এ খাবারগুলো খেতেও মজাদার। কিন্তু খাবার-দাবারে অবশ্যই এগুলোর ক্ষেত্রে সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে আমরা তো আর মাংস না খাওয়ার পরামর্শ দিতে পারি না, তাই আমরা বলি মাংস খাবেন তবে, অবশ্যই পরিমিত মাত্রায় খেতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে কেউ কেউ বলেন যে, খেলেও যেহেতু মরে যাব আবার না খেলেও মরে যাব, তার চেয়ে বরং খেয়ে মরি। ইমোশনাল কথাবার্তা বলে তো আপনি নিজের মৃত্যুকে নিজেই ডেকে আনতে পারেন না। খাবেন অল্পস্বল্প করে, কারণ ঈদের সময় তো খেতেই হয়। তবে সংযম নিয়েই খাওয়া উচিত।

দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা