• মঙ্গলবার   ২৮ জুন ২০২২ ||

  • আষাঢ় ১৩ ১৪২৯

  • || ২৬ জ্বিলকদ ১৪৪৩

হাইড্রোজেন পার অক্সাইড রফতানি করে ১০ মাসে আয় ২০৭ কোটি টাকা

দৈনিক গাইবান্ধা

প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২২  

বহুল আলোচিত হাইড্রোজেন পার অক্সাইড রফতানি করে গত ১০ মাসে ২০৭ কোটি টাকা আয় করেছে বাংলাদেশ। দেশের অন্তত ৬টি কারখানায় উৎপাদিত হয় হাইড্রোজেন পার অক্সাইড। পৃথিবীর ১৪টি দেশে রফতানি হয় দেশে উৎপাদিত এই রাসায়নিক পদার্থটি। যেসব দেশে বস্ত্র কারখানা বেশি, সেখানেই মূলত রফতানি করে বাংলাদেশের রফতানিকারকেরা। চট্টগ্রামের সীতাকু-ের বিএম কন্টেনার ডিপোতে অগ্নিকা-ের ঘটনার আগে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড দাহ্য পদার্থটির নামও অনেকেই জানত না। ভয়াবহ এই অগ্নিকা-ে-বিস্ফোরণে মর্মান্তিক হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় এই দাহ্য পদার্থটি এখন দেশব্যাপী বহুল আলোচিত। এই অগ্নিকা-ের ঘটনায় ৮ জনকে আসামি করে থানায় মামলা হয়েছে। মামলার তদন্তে, অনুন্ধানে, জিজ্ঞাসাবাদে

হাইড্রোজেন পার অক্সাইড নামক দাহ্য পদার্থ বিএম কন্টেনার ডিপোতে রাখার বিষয়ে আইনকানুন, নিয়মনীতি ও সতর্কতাসহ নানা বিষয় তদন্তে সামনে এসেছে।

তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেছেন, বিএম কন্টেনার ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকা- ও বিস্ফোরণে হতাহত, ক্ষয়ক্ষতিতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার কারণে বহুল আলোচিত হাইড্রোজেন পার অক্সাইড দাহ্য পদার্থটির বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। বিএম কন্টেনার ডিপোতে অগ্নিকা-ের আগে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড দাহ্য পদার্থটির গুদামে রাখার আইনকানুন বা নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হতো না। এখন এই দাহ্য পদার্থটি উৎপাদন, রফতানি, মওজুদ, গুদামে রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়েছে। হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের কারণে বিএম কন্টেনারের ডিপোতে অগ্নিকা- ও বিস্ফোরণের ঘটনা এত বেশি ভয়াবহ ও মর্মান্তিক কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএম কন্টেনার ডিপোতে অগ্নিকা-ের পর কুমিরা থেকে যাওয়া দমকল বাহিনীর প্রথম দলটি গিয়ে অগ্নিকা- নির্বাপণ করা শুরু করে। অগ্নিকা- যখন নিয়ন্ত্রণে আনার প্রাণপণ চেষ্টার মধ্যেই সীতাকু- থেকে আরেকটি দমকল বাহিনীর দল অগ্নিনির্বাপণে অংশ নেয়। অগ্নিকা- নিয়ন্ত্রণে আসার সময়েই হঠাৎ করে বিকট শব্দে আগুন ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের কন্টেনারগুলো বিস্ফোরিত হয়ে বিএম ডিপোর প্রধান ফটকের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দমকল বাহিনীসহ অন্যরা আগুনে দগ্ধ হন এবং ডিপোর ভেতরে যারা ছিলেন তারা আর বের হতে পারছিলেন না। হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের কারণেই দমকল বাহিনীসহ এত মানুষের মৃত্যু, দগ্ধ ও ক্ষয়ক্ষতির কারণ।

সীতাকুন্ড ট্র্যাজেডির অন্যতম কারণ হাইড্রোজেন পার অক্সাইড বাংলাদেশ থেকে মোট ১৪টি দেশে রাসায়নিকটি রফতানি হয়। যেসব দেশে বস্ত্র কারখানা বেশি, সেখানেই মূলত রফতানি করে বাংলাদেশের রফতানিকারকেরা। ইপিবির তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রফতানি করেছে ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামে। এ ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দক্ষিণ আফ্রিকায় হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রফতানি করা হয়।

বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রফতানি করে আয় হয়েছে ২০৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে যে পরিমাণ রফতানি হয়েছে, তা আগের অর্থবছরের পুরো সময়ের চেয়ে ২৩ শতাংশ বেশি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের পুরো সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে রফতানি আয় হয়েছে তিন গুণ। হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রফতানিতে সরকার ভর্তুকি দেয় ১০ শতাংশ। মানে হলো, ১০০ টাকা রফতানি করলে সরকারের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়া যায় ১০ টাকা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ব্যবহার বিপজ্জনক। তাই নিরাপত্তাজনিত কারণে সব সময় এর জলীয় দ্রবণ পরিমিত পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। এটি নিজে দাহ্য পদার্থ না হলেও আগুন বা দাহ্য পদার্থের আশপাশে রাখলে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। হাইড্রোজেন পার অক্সাইড রাসায়নিক থাকার কারণেই সীতাকু-ের কন্টেনার ডিপোতে এত বড় বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে মনে করছেন দমকল বাহিনীর কর্মকর্তারা। বিএম কন্টেনার ডিপোতে অগ্নিকা-ের সময়ে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড কন্টেনারে বিস্ফোরণের পর পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা এই একটি কারণেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

বিএম কন্টেনার ডিপোতে যে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড রাখা হয়েছিল তা বিদেশে রফতানি করার জন্য। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পর্যায়ে এর ব্যবহার বেশি। ব্লিচিংয়ের জন্য টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি, বিশেষ করে ডাইং ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহার করা হয়। লেদার এবং এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিতেও ব্যবহৃত হয় হাইড্রোজেন পার অক্সাইড। ওয়াটার ট্রিটমেন্টসহ বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির কাজে ব্যবহার হয় এটি। এ ছাড়া বাথরুম পরিষ্কার, কাপড় ধোয়াসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যেও ব্যবহার হয় হাইড্রোজেন পার অক্সাইড। তবে নানা কাজে এর ব্যবহার হলেও সঠিকভাবে সঠিক তাপমাত্রায় এটি ব্যবহার না করলে বিপজ্জনক হতে পারে। কিন্তু নিরাপত্তার বিষয়টিতে সতকর্তা অবলম্বন না করার কারণেই অগ্নিকা- ও বিস্ফোরণের মাধ্যমে এত বড় সর্বনাশ ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের স্ফুটনাঙ্ক পানির তুলনায় ৫০ ডিগ্রী বেশি। সে কারণে বেশি তাপমাত্রায় এটা বিপজ্জনক হতে পারে। এর উচ্চ ঘনত্ব বেশি বিপজ্জনক। এ রকম রাসায়নিক যেন চোখ আর ত্বকের সংস্পর্শে না আসে সেজন্য সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ এটা ত্বকের ক্ষতি করতে পারে। ত্বকে ও চোখে জ্বালাপোড়া হতে পারে। সে কারণে চোখ বা ত্বকের সংস্পর্শে এলে তাড়াতাড়ি পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড প্রবেশ করলে মাথাব্যথা, নাক জ্বলা বা বমিও হতে পারে। অতিরিক্ত হাইড্রোজেন পার অক্সাইড ফুসফুসেও সমস্যা তৈরি করতে পারে। চট্টগ্রামের সীতাকু-ের বিএম কন্টেনার ডিপোতে অগ্নিকা- ও বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে আহতদের মধ্যেও এই ধরনের সিমটম দেখা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড এটা শীতল, শুষ্ক, ভালভাবে বাতাস চলাচল করে এরকম জায়গায় সংরক্ষণ করা উচিত। বিশেষ করে দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে এটা রাখা বিপজ্জনক। দাহ্য পদার্থ থেকে দূরে এটাকে সংরক্ষণ করা উচিত। কারণ কোন দাহ্য পদার্থের কাছে থাকলে বা আগুন লাগার জায়গায় হাইড্রোজেন পার অক্সাইড থাকলে আগুন বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে যেতে পারে এবং বিস্ফোরণও ঘটতে পারে। রাসায়নিক সংরক্ষণের ম্যাটারিয়াল সেফটি ডেটশিট অনুযায়ী হাইড্রোজেন পার অক্সাইড রাখতে হবে গ্লাস, স্টেইনলেস স্টিল, এ্যালুমিনিয়াম অথবা প্লাসিক কন্টেনারে। অন্য কোন ধাতুর সংস্পর্শ পেলে এটা বিক্রিয়া করে। হাইড্রোজেন পার অক্সাইড বিস্ফোরণ হবে কিনা, তা পারিপার্শ্বিক অনেকগুলো অবস্থার ওপর নির্ভর করে বলে বিশেষজ্ঞদের দাবি।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের বিস্ফোরণের আগুন নেভাতে হয় অন্য কৌশলে। ফগ সিস্টেমে এ ধরনের আগুন নেভানো সম্ভব। এছাড়া ফোম বা ড্রাই পাউডার জাতীয় অগ্নি নির্বাপণ যন্ত্র দিয়ে এমন আগুন নেভাতে হয়। কারণ পানির সংস্পর্শে এলেও বিস্ফোরক আচরণ করতে পারে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড। এটি যেহেতু রাসায়নিক যৌগ সেই কারণে হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের কারণে কোন আগুন লাগলে সেটি পানি দিয়ে নেভানো যায় না। এ ধরনের আগুন লাগলে তার আশপাশে কোন অক্সিডাইজিং এজেন্ট থাকলে সেটা আগুনের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। পর্যাপ্ত তাপ ও জ্বালানি পেলেই আগুনের তীব্রতা বাড়ে এবং এই তীব্রতা বিস্ফোরণও ঘটতে পারে। হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের আগুন নেভানোর বিষয়টি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা ছিল না অগ্নিনির্বাপণে যাওয়া দমকল বাহিনীর দলগুলোর। ফলে অনভিজ্ঞতার মাসুল গুনতে হয়েছে দমনকল বাহিনীসহ সবাইকে। বিএম কন্টেনার ডিপোতে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড সংরক্ষণকারী কর্তৃপক্ষেরও এই দাহ্য পদার্থটি সংরক্ষণের নিরাপত্তার বিষয়ে দায়িত্বহীনতার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠে আসছে তদন্তে।

দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা