• মঙ্গলবার   ২৮ জুন ২০২২ ||

  • আষাঢ় ১৫ ১৪২৯

  • || ২৭ জ্বিলকদ ১৪৪৩

রেমিট্যান্সে জোর সরকারের, আগামী বাজেটে বাড়ছে প্রণোদনা

দৈনিক গাইবান্ধা

প্রকাশিত: ২০ মে ২০২২  

কোনো ব্যাংক ১ ডলারে নিচ্ছে ৯৫ টাকা, কেউবা নিচ্ছে ৯৮। অর্থাৎ ১০০ ছুঁইছুঁই। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এই ডলার তারা কিনছে ৮৭ টাকা ৫০ পয়সায়। অর্থাৎ মুদ্রা বিনিময় করে সাড়ে ৭ টাকা থেকে ১০ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত মুনাফা করেছে ব্যাংকগুলো। অথচ ৮৭ টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করে এক বছরে ব্যাংকের সর্বোচ্চ আয় হতে পারে ৭ টাকা ৮৩ পয়সা।

উত্তপ্ত ডলারের বাজার। টাকার মান পড়ছেই। বাংলাদেশ ডলারের যে দাম ঠিক করে দিয়েছে, খোলাবাজারে তার চেয়ে ১৫ টাকা বেশিতেও বিক্রি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাটি।

এ নিয়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার শেষ নেই। তবে এই সংকট কিন্তু দেশের ব্যাংকগুলোর জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ করে দিয়েছে। কোনো ব্যাংক ১ ডলারে নিচ্ছে ৯৫ টাকা, কেউবা নিচ্ছে ৯৮। অর্থাৎ ১০০ ছুঁইছুঁই। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এই ডলার তারা কিনছে ৮৭ টাকা ৫০ পয়সায়।

অর্থাৎ মুদ্রা বিনিময় করে সাড়ে ৭ টাকা থেকে ১০ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত মুনাফা করেছে ব্যাংকগুলো। অথচ ৮৭ টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করে এক বছরে ব্যাংকের সর্বোচ্চ আয় হতে পারে ৭ টাকা ৮৩ পয়সা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে একই জায়গায় ‘স্থির’ ছিল ডলারের দর। ২০২১ সালের ৫ আগস্ট আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলার ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় বিক্রি হয়। এর পর থেকেই শক্তিশালী হতে থাকে ডলার; দুর্বল হচ্ছে টাকা।

সবশেষ চলতি মাসের ১৬ তারিখ ডলারের বিপরীতে টাকার মানে বড় দরপতন হয়। এক দিনেই ইউএস ডলারের বিপরীতে ৮০ পয়সা দর হারায় টাকা। দেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই এক দিনে টাকার এতটা দরপতন হয়নি। আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজারে এখন ১ ডলারের জন্য ৮৭ টাকা ৫০ পয়সা খরচ করতে হচ্ছে। এর আগের সপ্তাহেও যা ছিল ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা।গত ৯ মাসে টাকার বিপরীতে ডলারের দর বেড়েছে ৩ দশমিক ১৮ শতাংশ।

তবে খোলাবাজারের পরিস্থিতি ভিন্ন। এমনিতে মানি এক্সচেঞ্জে ডলারের দাম সাধারণত ব্যাংক রেট থেকে কিছু বেশি থাকে। কিন্তু মঙ্গলবার ১০১ থেকে ১০২ টাকাতেও বিক্রি হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী মুদ্রাটি। এই সুযোগ নিচ্ছে ব্যাংকও। তাদের কাছে ডলার কিনতে যাওয়ার পর একেক ব্যাংক একেক দাম চাইছে গ্রাহকদের কাছ থেকে।

কোন ব্যাংকে কত রেট

ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে দামে ডলার কেনে বা বিক্রি করে, তাকে আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজার বলে। এ হিসাবে আন্তব্যাংক রেটের চেয়ে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি দামে নগদ ডলার বিক্রি করছে ব্যাংকগুলো। কিন্তু এই ব্যবধান বা পার্থক্য এক-দেড় টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।

ব্যাংকগুলো বেশি দামে ডলার বিক্রি করলে বাংলাদেশ ব্যাংক হস্তক্ষেপ করে থাকে। এর আগে দেখা গেছে, ব্যাংকগুলোর বিক্রি করা ডলারের দর আর আন্তব্যাংক রেটের মধ্যে বেশি ব্যবধান হলে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই পার্থক্যের একটা সীমা নির্ধারণ করে দিত; সেটা এক থেকে দুই টাকার মধ্যে থাকত। কিন্তু কয়েক মাস ধরে ব্যাংকগুলো আন্তব্যাংক রেটের চেয়ে অনেক বেশি দামে ডলার বিক্রি করলেও এখন পর্যন্ত কোনো হস্তক্ষেপ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।

সে কারণে দিন যত যাচ্ছে, ইচ্ছেমতো যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলারের দাম বাড়িয়ে চলেছে ব্যাংকগুলো। বিভিন্ন ব্যাংকের ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানার জনতা ব্যাংক থেকে এক ডলার কিনতে গুনতে হয়েছে ৯৪ টাকা। আর গ্রাহকের থেকে ডলার কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংকটির দর ৯২ টাকা।

অগ্রণীতে বিক্রি হয়েছে ৯২ টাকা ৫০ পয়সা। আর কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংকটি নিয়েছে ৯০ টাকা ৫০ পয়সা।সোনালীতে ১ ডলার কিনতে গুনতে হচ্ছে ৯২ টাকা ৪৫ পয়সা। আর ব্যাংকটি কিনেছে ৯২ টাকা দরে। রূপালীতে ১ ডলার কিনতে দিতে হচ্ছে ৮৭ টাকা ৬০ পয়সা। আর ব্যাংকটি নিজে কিনছে ৮৬ টাকা ৬০ পয়সা দরে।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকে ১ ডলার কিনতে হচ্ছে ৮৬ টাকা ৬০ পয়সায়। ব্যাংক এশিয়ার গ্রাহকের কাছ থেকে ডলার কেনার ক্ষেত্রে দিচ্ছে ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু ব্যাংকটি ১ ডলার বিক্রি করছে ৮৬ টাকা ৮০ পয়সায়। ব্র্যাক ব্যাংকে ১ ডলারে গুনতে হবে ৮৭ টাকা ৬০ পয়সা। আর ব্যাংকটি গ্রাহক থেকে কেনার ক্ষেত্রে দিচ্ছে ৮৬ টাকা ৬০ পয়সা।

সিটি ব্যাংকের ১ ডলার সমান ৮৬ টাকায় কেনাবেচা করছে। ইস্টার্ন ব্যাংকে এক ডলারে ৮৭ টাকা ৬০ পয়সা গুনতে হবে। আর ব্যাংকটি নিজে কেনার ক্ষেত্রে গ্রাহককে দিচ্ছে ৮৬ টাকা ৬০ পয়সা। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকেও একই দরে বেচাকেনা হচ্ছে। প্রাইম ব্যাংক বুধবার ৯৮ টাকা দরে নগদ ডলার বিক্রি করেছে। কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংকটির রেট ৯৬ টাকা।

বিদেশি ব্যাংক কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনে ডলারের সবচেয়ে চড়া দাম। ব্যাংকটির ওয়েরসাইটে দেখা গেছে, ১ ডলার বিক্রির ক্ষেত্রে ব্যাংকটি নিচ্ছে ৯৮ টাকা। আর গ্রাহকের কাছ থেকে কেনার ক্ষেত্রে ১ ডলার সমান ৮৬ টাকা ৬০ পয়সা। সিটি ব্যাংক এনএ-তে ১ ডলার ৮৬ টাকা ৬৭ পয়সা দরে কেনাবেচা হচ্ছে।

ব্যাংকাররা যা বলছেন

ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান এইচ মনসুর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ডলারের বাজারে চরম অস্থিরতা চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে প্রচুর ডলার বিক্রি করেও বাজার স্বাভাবিক রাখতে পারছে না। এভাবে হস্তক্ষেপ করে বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে না। বাজারকে বাজারের মতো চলতে দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে যদি আন্তব্যাংক রেট আরও বেশি হয়, তাও যেতে দিতে হবে। তাহলে ব্যাংকগুলো ও কার্ব মার্কেটের সঙ্গে ব্যাংক রেটে ডলারের যে পার্থক্য তা কমে আসবে। ধীরে ধীরে বাজারও স্থিতিশীল হয়ে আসবে।’

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শামস-উল-ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম মানতে গিয়ে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। আমদানি চাহিদা বাড়ছে, রেমিট্যান্স কমেছে। ডলারে কিছু ব্যাংক আগ্রাসী রেট ধরে দিচ্ছে। এটাতে মিডলম্যান লাভবান হচ্ছে, প্রবাসীরা হয় না। সকল ব্যাংকে এক রেট হওয়া উচিত।’

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এমডি আবুল কাশেম মোহাম্মদ শিরিন বলেন, ‘সারা দেশের সব ব্যাংকে এক রেট করা উচিত। ব্যাংকের চেয়ে হুন্ডি রেট বেশি দিলে ব্যাংকের রেমিট্যান্স কমে যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি রেট দিলে আমরা পরিপালন করি, অন্য যারা করছে না তারা রেমিট্যান্স বেশি পায়। এতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। তাই যেকোনো নিয়ম করলে যাতে সবাই পরিপালন করে সেই ব্যবস্থা করা উচিত।’

কী বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘খোলা বাজারে ডলার অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। চাহিদা বেশি, তাই গ্রাহকদের অতিপ্রয়োজনীয় সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী ডলারের দাম বেশি নিয়ে অতি মুনাফা করছে।’

আমদানির ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোও বেশি দামে ডলার বিক্রি করছে এমন প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, ‘যেসব ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দরে ডলার বিক্রি করছে, তাদের বিষয়টি তদারকি করা হবে। কোনো অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা