• শনিবার   ১০ ডিসেম্বর ২০২২ ||

  • অগ্রাহায়ণ ২৫ ১৪২৯

  • || ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

পড়াশোনার পাশাপাশি মুরগিতে মাসে আয় ৬০ হাজার টাকা

দৈনিক গাইবান্ধা

প্রকাশিত: ৩ অক্টোবর ২০২২  

সাজ্জাদুল ইসলাম আপনের (২০) জন্ম ও বেড়ে ওঠা বগুড়ার গাবতলীতে। বাবা মো আব্দুল কাইয়ুম তরফদার একজন স্টেশনারি ব্যবসায়ী ও মা মোছা. স্বপ্না বেগম গৃহিণী। মেধাবী ছাত্র আপন বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ২০১৭ সালে জিপিএ ফাইভ পেয়ে মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হন।

এরপর ২০১৯ সালে বগুড়া সরকারি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। বর্তমানে তিনি গাইবান্ধা সরকারি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র। দুই ভাইয়ের মধ্যে আপন বড়।

আপন পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনে মুরগির ব্যবসা করেন। ফেসবুকে ‘শখের মুরগিওয়ালা’ পেজ খুলে তার পথচলা শুরু। অনলাইনেই মুরগি বেঁচে আপন মাসে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় করেন। এ দিয়ে তার পড়ালেখার পাশাপাশি পরিবারকেও সাহায্য করেন।

শুরুর গল্প
আপন ২০১৯ সাল থেকে পড়াশোনার জন্য মেসে থাকতেন। মেসে থাকা অবস্থায় হঠাৎ করেই করোনা মহামারি শুরু হয়। এসময় মেস বন্ধ হয়ে যায়। তখন আপন বাসায় চলে আসেন। আপনের আগে থেকেই বাসায় কিছু কবুতর এবং শখের পাখি ছিল। আপন জানান, আগে থেকেই তার পশুপাখি ভালোলাগতো। করোনার সময় সবাই গৃহবন্দি কাটিয়েছে। তখন আপন গৃহবন্দি থেকেও কবুতর, শখের পাখির পরিচর্যা এবং পড়াশোনা চালিয়ে যান।

আপন যেহেতু পাখি ও কবুতর পুষতেন তাই এই সম্পর্কিত ফেসবুক গ্রুপে যুক্ত ছিলেন। হঠাৎ করেই তিনি কিছু বিদেশি জাতের মুরগি ফেসবুকে দেখতে পান। এগুলো তখন তার খুব ভালোলাগে। তিনি এ মুরগিগুলোর নামও জানতেন না। পরে গ্রুপ থেকে জানতে পারেন এগুলো সিল্কি মুরগি।

আপন বলেন, ‘আসলেই এটি পৃথিবীর সুন্দর মুরগিগুলোর একটি এবং বিভিন্ন দেশে অনেক জনপ্রিয়। তারপর আমি সিল্কি মুরগির তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করলাম। অনেকেই এই মুরগির সেল পোস্ট করত ফেসবুক গ্রুপে। আমি প্রথমে দামের ধারণা নেওয়ার জন্য বিভিন্ন সেলারের কাছ থেকে দাম শুনতাম’।

ঝুঁকি নেওয়া
আপন বলেন, ‘আমার অনেক ইচ্ছা হচ্ছিল মুরগি নেওয়ার কিন্তু আমার কাছে কোনো টাকা ছিল না। এজন্য কিনতেও পারছিলাম না। আমি অনেকের কাছে দাম শুনেছি, কিন্তু কিনতে পারিনি। এমন সময় আমি আমার আম্মুর কাছ থেকে টাকা চাই, আম্মু আমাকে ১ হাজার টাকা দাও আমি কিছু মুরগির বাচ্চা কিনব। আম্মু কিছু চিন্তা না করেই আমাকে সেই টাকাটা দিয়ে সাহায্য করেন’।

টাকা পাওয়ার পর আপনের সমস্যা দাঁড়ায় কিভাবে সে মুরগিগুলো সংগ্রহ করবে কারণ তার টাকা অল্প আবার তিনি কখনো অনলাইনে লেনদেন করেননি। তার ভয় লাগতো টাকাটা যে কি হয়? অনলাইনের তারা যদি প্রতারক হয়। তাই আপন খুঁজতে থাকে বগুড়া জেলা বা জেলার আশেপাশে কে আছেন, কে মুরগি বিক্রি করতে চায়? হঠাৎ একদিন বগুড়ার আতাউস সামাদ রাহুল নামের একজনের পোস্ট দেখতে পারেন। পরে আপন তার বাসায় গিয়ে ১ হাজার টাকা দিয়ে ২টা ১ মাসের সিল্কি মুরগির বাচ্চা সংগ্রহ করেন।

মুরগি পালন
এরপর মুরগিগুলো বাসায় এনে লালন-পালন শুরু করেন আপন। তিনি যার কাছ থেকে মুরগিগুলো সংগ্রহ করেছেন তিনি তাকে মুরগিগুলো লালন-পালনের দিকনির্দেশনা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। এই মুরগির বাচ্চাগুলো বড় হতে প্রায় ৫ মাস সময় লেগে যায় আপনের।

এদের বয়স যখন ৬ মাস হয় তখন এগুলো ডিম দেওয়া শুরু করে। এদের থেকে যে বাচ্চা পেয়েছিলো তা থেকে নিজের জন্য আবার দুই জোড়া রেখে বাদ বাকি অনলাইনে বিক্রি করে দেন। আপন ২টি মুরগি থেকে ১০টা বাচ্চা বড় করেছিলেন। সেগুলোও পরবর্তীতে ডিম দেওয়া শুরু করে।

আপন বলেন, ‘তখন আমার আরও নতুন নতুন শৌখিন জাতের মুরগি সংগ্রহ করার শখ জাগে। কিন্তু মুরগি রাখার জন্য আমার কোনো জায়গা ছিল না। কবুতরের বা পাখির খাঁচায় রাখতাম। আমার বাসার ভিতরে ছোট একটা মাচার ঘর ছিল। তখন আমি চিন্তা করলাম এই জায়গায় একটা মুরগি রাখার ঘর বানাতে পারি। আমার মুরগিগুলো তখনও ডিম দিচ্ছিলো। আমি সেগুলো থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে বাচ্চা বিক্রি করে কিছু টাকা জমিয়ে ওই মাচার ঘরে নেট, কাঠ দিয়ে ৩ তাকের ৯টি ছোট খাঁচা বানাই। এই খাঁচাগুলো আমি এবং আমার ছোট ভাই নিজেরাই বানিয়েছিলাম। তারপর আমি আসতে আসতে নতুন জাতের মুরগি কেনা শুরু করি’।

প্রতিকূলতা
আপনকে শুরুতে অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। প্রথম দিকে আপনের বাবা এসব একদম মেনে নিতে পারেনি। আপনকে বলতো, ‘তুমি জিলা স্কুলের ছাত্র হয়ে মুরগি বেঁচো, এইটা কোনো কথা? তুমি ইংরেজিতে অনার্স করছো আর মুরগি পালতেছো, বিক্রি করতেছো। এইটা ঠিক?’

আপন আরও বলেন, ‘একদিন আমি মুরগি ডেলিভারি দিয়ে বাসায় ফিরছিলাম বাবার দোকানের সামনে দিয়ে। বাবা তখন বললো কই গিয়েছিলে? আমি বললাম কিছু মুরগি বাচ্চা ঢাকায় পাঠাইতে। উনি ঠাট্টার ছলে বললেন, ‘টাকা দিয়েছে? নাকি এমনি পাঠায় দিলা? আমি বললাম টাকা দিয়েছে বিকাশে। বাবা বিশ্বাস করতে পারেননি। আমার বিকাশের ব্যালেন্স চেক করেছেন তারপর উনি বিশ্বাস করলেন যে অনলাইনেও মুরগির বাচ্চা বিক্রি হয়। তখন আর কিছু বললো না, শুধু বললো, যা করছো করো। পড়ালেখা যেনো ভালো মতো হয়’।

ভিন্ন জাতের মুরগি নিয়ে পথচলা
সিল্কি জাতের মুরগির পর ব্রাহামা জাতের মুরগি পালন শুরু করেন আপন। এরপর বেন্তাম, কোচিন, ফাইটারসহ আরও কিছু ডিমের মুরগি সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর আপনকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তখন তার মুরগির বাচ্চা অনলাইনে ভালোই বিক্রি হচ্ছিলো। বিক্রি করে যে টাকা আয় করেন তা দিয়ে মুরগির খাবার ঔষধসহ আরও নতুন নতুন জাতের মুরগির বাচ্চা সংগ্রহ করেন। এমন সময় আপনের ছোট্ট খামারটি বিভিন্ন জাতের মুরগিতে ভরে গেছে। মুরগি রাখার আর জায়গা নাই।

আপন বলেন, ‘২০২১ সালের দিকে আমার বাবার বড় বড় ব্রাহামা মুরগিগুলো দেখে খুব ভালো লাগে। তখন থেকে উনি আমাকে আস্তে আস্তে সাপোর্ট করা শুরু করেন। তখন আব্বু আমাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি এক টাকাও সাহায্য না নিয়ে মুরগির বাচ্চা বিক্রি করে নিজের টাকা এবং আরও মুরগি সংগ্রহ করেছি’।

ছোট্ট খামারটি অল্পকয়েক দিনেই ভরে গেছে আর মুরগি রাখার একদম জায়গা ছিল না। এসময় আপনের বাবা নিজেই উদ্যোগ নিয়ে তাদের বাসার ভিতরেই লম্বা ২০ ফিট বাই প্রস্থ ১০ ফিট নতুন খামার তৈরি করে। আগের মতো করে এখানেও ৩টা করে তিন তালা তাক বানায়। এতে আপনের খামারে সর্বমোট ১৮টি খোপ হয়। নতুন এ খামার বানাতে আপনের খরচ হয়েছিলো ৬০ হাজার টাকা।

খামারের বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে আপনের খামারে ব্রাহমা, সিল্কি, কোচিন, বেন্তাম, পলিশক্যাপ, ফ্রিজেল, ফনিক্স, ইয়োকোহামা, অনাগাদুরি, মালয়েশিয়ান শো শেরেমা, সেব্রাইট, হোয়াইট ফেস স্পানিশ, রোসকম্ব, সুমাত্রা, ফাইটারসহ ১৬ থেকে ১৮ প্রাজাতির শতাধিক মুরগি রয়েছে। এগুলোর কোনো কোনো এডাল্ট মুরগির জোড়া ৪ হাজার টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

আপনের খামারে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট মুরগি মালয়েশিয়ান শো শেরেমা এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুরগি আমেরিকান ব্রাহামা রয়েছে। এগুলো থেকে আপন প্রতিনিয়ত বাচ্চা পাচ্ছেন। আপন খামার থেকে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫টা ডিম ও প্রতি সপ্তাহে ৫০ থেকে ৬০টি বাচ্চা উৎপাদন করে থাকেন। যা থেকে আপন মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় করেন।

আপন এই বাচ্চা বা বড় মুরগিগুলো এ পর্যন্ত ৫৫টি জেলায় পৌঁছে দিয়েছেন। আপন সাধারণত এগুলো বাসের মাধ্যমে মানুষের কাছে ডেলিভারি দিয়ে থাকেন। আপনের খামারে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিদিন অনেক তরুণ উদ্যোক্তা দেখতে আসেন। তারা এসে খামার থেকে দেখে বাচ্চা বা বড় মুরগি সংগ্রহ করে নিয়ে যান।

অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
আপন ইতিমধ্যেই উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রদর্শনী মেলা থেকে সফল খামারি ও তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে ২টি পুরস্কার পেয়েছেন। আপনের ইচ্ছা তিনি আরও বড় আকারে একটা বিদেশি শৌখিন মুরগির খামার দিবেন। এরই মধ্যে আপন তার খামারের মাধ্যমে তার সমবয়সী ৩ জন বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

তরুণদের জন্য পরামর্শ
আপন তরুণ উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘যদি কেউ এসব মুরগি লালন পালন করতে চায় আমি তাদের বিনা মূল্যে এসব বিদেশি মুরগি পালন সম্পর্কিত সকল তথ্য দিয়ে সাহায্য করব। আমি বলতে চাই আপনারা চাইলে ২টি দেশি মুরগির বাচ্চা দিয়েও শুরু করে দেখতে পারেন। বুঝতে চেষ্টা করুন আপনারা ঠিকভাবে লালন-পালন করতে পারছেন কিনা? তারপর শৌখিন মুরগি সংগ্রহ করুন। অনেকেই আবার ভাববেন একবারে লাখ টাকার মুরগি কিনব আর উদ্যোক্তা হয়ে যাবো, এমন ঝুঁকি না নিয়ে ২ থেকে ৪টি মুরগি দিয়ে শুরু করুন। ভালো ফলাফল পাবেন। আমি মনে করি আমাদের দেশের অনেক যুবক বসে না থেকে যে যেই বিষয়ে দক্ষ সেই বিষয়ে কাজ শুরু করুক। বাধা-বিপত্তি আসবেই সেগুলো মোকাবেলা করে সফলতার চূড়ায় পৌঁছাতে হবেই’।

দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা