বুধবার   ২০ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ৫ ১৪২৬   ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

১৭

হিমালয়ের পাগলা মধু ও মাউলি ধান

প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০১৯  

বাজার থেকে মধু কিনে এনে খাওয়া কতো সহজ কাজ তাইনা কিন্তু এই সহজ কাজটি আপনি যে করছেন, সেটা কিভাবে এতোটা সহজ ভেবে দেখেছেন কখনো? বাজার থেকে মধু কিনে আনাটা যতটা সহজ বাজার পর্যন্ত সেই মধুগুলিকে এনে পৌছানো তার কয়েকগুন কঠিন একটি কাজ।

মৌমাছি ফুলে ফুলে ঘুরে মধু আহরণ করে মৌচাকে সংরক্ষণ করে। মৌয়ালরা সেই মধু মৌচাক থেকে সংগ্রহ করে। তবে মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ কাজটি মোটেই সহজ নয়। হাজার হাজার মৌমাছির বিষাক্ত কামড় সহ্য করতে হয় এই কাজটি করতে।  পাগলা মধুর নাম শুনেছেন কখনো? কি ভাবছেন মধু আবার কিভাবে পাগলা হয়? 

অবাক হওয়ার কিছু নেই। পৃথিবীতে এমন এক মধু আছে যার নাম পাগলা মধু। তবে মধুটির এমন নামকরণের কারণ আছে। চলুন আজ এই পাগলা মধু সম্পর্কে জেনে নেই কিছু তথ্য।

পাগলা মধু 

পাগলা মধু শুধুমাত্র পৃথিবীর একটি স্থানে পাওয়া যায়। সেটি হল হিমালয়। হিমালয়ের মৌমাছিরা এই মধু সংগ্রহ করে। 

হিমালয়ের মৌমাছির কিছু বিশেষত্ব আছে। সেখানকার মৌমাছিগুলি সাধারণ মৌমাছির মত নয়। আকারে এরা সাধারণ মৌমাছির থেকে অন্তত পাঁচ গুণ বড় এবং এরা অন্য মৌমাছির তুলনায় বেশি বিষাক্ত এবং এদের কামড় বা হুলের ব্যথাও অনেক বেশি। 

মৌমাছিগুলির সাধারণ অবস্থান হল সুউচ্চ গ্রানাইটের পাহাড়ের কয়েকশ ফুট উঁচু কোন এক খাড়া ঢালের গায়ে। হিমালয়ের মৌমাছিগুলো বছরের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের মধু উৎপাদন করে। মধুর প্রকার সাধারণত মৌসুমের উপর নির্ভর করে। মৌসুমি ফুলের বিভিন্ন রস আহরণ করে হিমালয়ান মৌমাছিগুলি মধুও উৎপাদন করে ভিন্ন ধরণের। তবে মার্চ ও এপ্রিল মাসে এরা এক ভিন্ন ধরণের মধু উৎপাদন করে।

 

 

 

এসময়ে বড় বড় রোডোডেনড্রন গাছগুলিতে বাহারি রঙের ফুল ফোটে। ফুলগুলিতে একধরণের সাইকোট্রপিক টক্সিন থাকে । এই টক্সিন সমৃদ্ধ রস থেকে হিমালয়ান মৌমাছিগুলি যে মধু উৎপাদন করে সেগুলিকে বলা হয় 'ম্যাড হানি' বা 'পাগলা মধু' । 

শত শত বছর ধরে এই মধুকে কুলুং সম্প্রদায়ের মানুষ কাশির ঔষধ এবং অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে বেশ কিছু বছর ধরে এই মধু চোরাই বাজারে একটি বিশেষ কারণে একচ্ছত্র রাজত্ব করছে।

পাগলা মধুর আরেকটি নাম আছে সেটি হল 'উত্তেজক মধু।' এই মধু চোরাবাজারে এর মাদকীয় গুণের জন্য খ্যাত। এছাড়াও কাঠমুণ্ডুর অলিগলিতে দেবদেবীর মূর্তি তৈরীর কারখানায় ব্রোঞ্জ মূর্তি তৈরী করার জন্য এই মধু ব্যবহার করা হয়। ফলে, এশিয়ার চোরা বাজারে এক পাউন্ড পাগলা মধুর মূল্য ৬০ ডলারেরও বেশি যা সাধারণ মধুর মূল্যের ৬ গুণ বেশি। এসব কারণে এই মধুর বাজারে এতদিন বিশেষ চাহিদা ছিল। 

চাহিদা এখনও আছে তবে মধু নেই।  আসলে ভুল বললাম, মৌচাকে মধু ঠিকই আছে, তবে যা নেই সেটি হল এই মধু সংগ্রহকারী মৌয়াল। 

এই মধুটির সংগ্রহ এখন আর কেন হয়না সেসম্পর্কে আমরা জানবো। তবে তার আগে জানতে হবে একজন ব্যাক্তি সম্পর্কে  যার নাম এবং কাজকে এখন একটি ইতিহাসের অংশ বললে ভুল হবেনা এবং সেই ব্যক্তিও পাগলা মধুর নামের সঙ্গে জড়িত। চলুন আমরা জানি সেই ব্যাক্তি সম্পর্কে ।   

"মৌমাছি , মৌমাছি 
কোথা যাও নাচি নাচি
দাঁড়াও না একবার ভাই।"
"ওই ফুল ফোটে বনে 
  যাই মধু আহরণে 
দাঁড়াবার সময়তো নাই।" 

কবিতাটি ছোটবেলায় আমরা সবাই পড়েছি তাইনা। কি ভাবছেন আজ হঠাৎ এই কবিতার কথা কেন  বলছি? 

মৌমাছির যেমন মধু সংগ্রহের জন্য ফুলে ফুলে ছুটতে হয় তেমনি সেই মধুকে মৌচাক থেকে সংগ্রহের জন্য ছুটতে হয় একজন মৌয়ালকে।
কিছু কাজ আমরা শুধু নেশা বা পেশা থেকে নয় বরং নিতান্তই বাধ্য হয়ে করি। কাজটি যদি হয় জীবিকা নির্বাহের একমাত্র পন্থা তাহলে তো পিছু ফিরবার আর কোন উপায় থাকেনা। 

হিমালয়ের মৌমাছিগুলির মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করতো এক  মৌয়াল যার নাম মাউলি ধান।

মাউলি ধানের পরিচয় 

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কুলুং সম্প্রদায়ের মানুষেরা অনেকটাই বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। এক কথায় বলা যায় দেশের অন্যান্য অপরাপর জনগোষ্ঠী থেকে একেবারে আলাদা এদের বসবাস। হোংগু উপত্যকার পাশ থেকে বয়ে চলা হোংগু নদী আর তার আশেপাশের বনজঙ্গল ঘিরে একটি গ্রাম যার নাম সাদির। এই সাদির গ্রামটি জুড়েই তাদের পৃথিবী আবর্তিত। সাদির গ্রামের বাইরে যাওয়ার তাদের তেমন কোন প্রয়োজন হয়না। এই গ্রামের বৃদ্ধরা এখনও নেপাল বলতে শুধুমাত্র কাঠমুন্ডু 'কেই বোঝে। কাঠমুন্ডু তাদের গ্রাম থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। 

এই কুলুং সম্প্রদায়ের মানুষরাই হিমালয় থেকে পাগলা মধু সংগ্রহের কাজ করতেন। হিমালয়ের হোংগু উপত্যকার কয়েকশ ফুট উপরে পাগলা মধুর মৌচাক অবস্থিত। কুলুং সম্প্রদায়ের একজন মৌয়াল মাউলি ধান। মাউলির বাবাও ছিল একজন মৌয়াল। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাবার হাতে মাউলির মধু সংগ্রহের হাতেখড়ি হয়।

বাঁশ আর দড়ির তৈরী ঝুলন্ত সিঁড়ি বেয়ে কয়েকশ ফুট উঁচুতে উঠে মধু সংগ্রহের কাজটি বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল ছোট মাউলির কাছে। মৌচাকটি পাথরের ওপর থেকে খুলে নেবার সময় মৌমাছি তার হাতে, পায়ে,মুখে সর্বত্র হুল ফুটাতে শুরু করলে ব্যথায় কাতর হয়ে যেত তিনি। তবু শক্ত করে দড়ি ধরে রাখতে হত দীর্ঘক্ষণ। মৌচাকটি স্ম্পূর্ণ  আলাদা না করে নামতে পারতেন না তিনি।

কুলুং সম্প্রদায়ের সবাই মধু সংগ্রহের কাজটি বহু আগে ছেড়ে দিয়েছে । প্রায় পনেরো বছর তো হয়েছে তাদের এই পেশা ছেড়ে দেয়ার। তাই এরপর মাউলিকে একাই এই কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে। 

কাজটি মাউলির জন্য কখনোই শখের বা নেশার ছিলোনা। তিনি এই কাজের ইতি টানতে চেয়েছেন বহুবার। কিন্তু পারেননি। খাদ্যশস্য এবং শাকসবজিতে তিনি স্বয়ংসম্পুর্ণ থাকলেও তেল, লবণ, পোশাকসহ আরো কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে তার অর্থের প্রয়োজন ছিল। তাই আর কেউ কাজটি না করলেও মধু সংগ্রহের এই ঝুঁকিপূর্ণ  কাজটি  তাকে করতেই হতো। তিনি তার সম্প্রদায়ের শেষ ব্যাক্তি যে এই মধু সংগ্রহের কাজ একাই দীর্ঘদিন করেছেন।

মাউলির পরিবার বেশ বড়। তার তিনজন স্ত্রী ছিল। ছয়জন সন্তান রেখে তারা মৃত্যুবরণ করে। সন্তানদের মাউলিই পালন করেছে। তার দুই কন্যা বিধবা হবার পর তারাও তার সাথে থাকতে শুরু করে। ফলে তার কাঁধে তার পাঁচ জন নাতি-নাতনির দায়িত্বও ছিল। এভাবেই জীবনের ৪২ বছর কাটিয়েছেন মাউলি। 

মাউলি ধানের বয়স এখন ৫৭ বছর। গত বছর জুলাই মাসেই নিজের কাজের সমাপ্তি টেনেছেন এই মৌয়াল। কুলুং সম্প্রদায়ের শেষ ব্যাক্তি হিসেবে মধু সংগ্রহ পেশার এবং রীতির ইতি টানেন তিনি।

হয়ত মাউলির এই ইতিহাস সম্পর্কে আমরা কখনোই জানতে পারতাম না। ন্যাশনাল জিওগ্রাফির একটি টিম মাউলির অবসরের পুরো ঘটনাটি এবং তার অবসরের পূর্বের শেষ মধু সংগ্রহের ভিডিও চিত্র ধারণ করে। যার ফলে ইতিহাসের একটি গোষ্ঠীর রীতির সমাপ্তির দলিল থেকে যাবে চিরকাল।

ভিডিওটিতে মৌয়াল মাউলির কর্মজীবনের ক্রান্তিলগ্নের কিছু মুহূর্তেরও অংশ রয়েছে। মাউলি বলে, ' আমার সন্তানেরা স্কুলে পড়ালেখা করছে, তাদের আর এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশা গ্রহণ করতে হবেনা।' 

মাউলি তার এইকাজ করতে করতে এখন ক্লান্ত। মৌয়াল পেশাটি ছেড়ে দিয়ে এখন বাকিটা জীবন তিনি নির্বিঘ্নে কাটাতে চান।

মাউলির শেষ মধু সংগ্রহের বর্ননা

গতবছর জুলাই মাসে মাউলি ধান তার সহযোগী আসধন কুলুংকে সাথে নিয়ে শেষবারের মত হোংগু উপত্যকায় চড়েছিলেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফির কর্মকর্তাদের বিস্ময় বাড়িয়ে দিয়ে কোনোরকম নিরাপত্তা দড়ি ছাড়াই উপত্যকার ওপর থেকে ঝুলানো বাঁশ এবং দড়ির তৈরী ঝুলন্ত সিঁড়ি বেয়ে আড়াইশ ফুট ওপরে উঠে যান তিনি।

 

 

তার কাঁধে ঝোলানো ছিল একটি বড় বাঁশ তার সাথে দড়িতে বাধা একটি ঝুড়ি এবং ধোঁয়া জ্বলানোর কিছু সরঞ্জাম। মৌচাক থেকে ১০ ফুট দূরত্বে থেকে বাঁশের আগায় ধোঁয়া জ্বালিয়ে সেটি মৌচাকের কাছে  নেন। ধোঁয়ার তীব্রতায় অল্পক্ষণের মধ্যেই মৌচাক থেকে মৌমাছিগুলি বেড়িয়ে আসতে শুরু করে এবং মাউলির শরীরে হুল ফুটায়। অবাক করা বিষয়টি হল প্রতি মুহূর্তে এতো এতো হিমালয়ান মৌমাছির কামড় খাওয়া সত্ত্বেও মাউলি বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। তার চেহারায় ব্যাথার কোন ছাপ ছিলনা। তিনি আপনসুরে গুণগুণ করে একটি মন্ত্র জপতে থাকেন।

কুলুংদের বিশ্বাস মন্ত্রটি ক্রোধান্বিত মৌমাছিদের শান্ত করে। মন্ত্র জপতে জপতে পরিপূর্ণ মৌচাকটি কাঁধে ঝুলে থাকা ঝুড়িতে ভরে নেন মাউলি। এই পুরো প্রক্রিয়াতে মাউলির দু'ই ঘন্টা সময় লেগেছিল। ঝুলে থেকে বিষাক্ত সব মৌমাছির কামড় খেয়ে মধু সংগ্রহের কাজ করার এই অফুরন্ত শক্তি মাউলি কোথায় পান সে কথা একমাত্র তিনিই জানেন। 

 

 

এই পেশাটিকে বাঁচিয়ে রাখা নিয়ে মাউলির কোনো খেদ নেই। বরং কুলুং সম্প্রদায়ের শেষ মৌয়াল হিসেবে দীর্ঘদিন পেশাটিকে বাঁচিয়ে রাখা নিয়ে তিনি গর্বিত। তিই এটা ভেবেও গর্বিত যে, তিনিই তার সম্প্রদায়ের পাহাড়ে চড়া সর্বশেষ মৌয়াল। 

তিনি এটা ভেবে শিহরিত হন যে, তার ভিডিওচিত্রটি দেখার পর পৃথিবীর মানুষ জানতে পারবে  যে নেপালের প্রত্যন্ত এক ছোট গ্রামে এরকম একটি পেশা ছিল। মৌচাকের মৌমাছিগুলি যদি বুঝতে পেরে থাকে যে মাউলি আর তাদের বাসা ভাঙতে আসবেনা তাহলে হয়ত তারাও অনেক খুশি হবে। 

দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা