• শনিবার   ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ||

  • ফাল্গুন ১৫ ১৪২৭

  • || ১৫ রজব ১৪৪২

সাদুল্লাপুরে বারোমাসি আম বাগান করে স্বাবলম্বী তরুণ

দৈনিক গাইবান্ধা

প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারি ২০২১  

করোনা মহামারি দেখা দিলে চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফেরেন তারা। এরপর তারা আবার মন দেন বাগান করার দিকে। এরপর তাদের আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তারা এই বারোমাসি আম বাগান থেকে এখন প্রতি মাসে আয় করছেন প্রায় লাখ টাকা।

শুরুটা ২০১৯ সালের মার্চে। মাত্র চার বিঘা জমি বর্গা নিয়ে শুরু করেন আম ও পেয়ারা গাছের চারা রোপন। প্রথমে পাঁচশ আম ও আড়াইশ পেয়ারা গাছের চারা রোপন করেন তারা। এরপর দেড় বছরের নিবিড় পরিচর্যায় তা রূপ নেয় পরিপূর্ণ বাগানে।

এই বাগানের বারোমাসি আম ও পেয়ারা বিক্রি করে প্রতি মাসে এখন তাদের আয় হচ্ছে প্রায় লাখ টাকা।

এই তিন জন হচ্ছে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ছোট ছত্রগাছা গ্রামের রুবেল মন্ডল, মাসুদ রানা ও জাহিদ হাসান জয়। তিন জনই পড়ালেখা করেছেন পলিটেকনিক্যাল কলেজে।

এদের মধ্যে রুবেল মন্ডল ২০১৮ সালে ঢাকা পলিটেকনিক্যাল থেকে (ইলেকট্রিক্যাল) ডিপ্লোমা ও মাসুদ রানা টেক্সটাইল ট্রেড নিয়ে বেসরকারি বগুড়া বিট পলিটেকনিক্যাল থেকে ডিপ্লোমা শেষ করেন। জাহিদ হাসান জয় গত বছরে ঢাকার শ্যামলী আইডিয়াল পলিটেকনিক্যাল থেকে শেষ করেন ডিপ্লোমা।

এই তিন তরুণ প্রথমে চার বিঘা জমিতে আমের চারা রোপন করেন। পাশাপাশি রোপন করেন সুস্বাদু ফল পেয়ারা গাছের চারাও। শুরু থেকে নিজেরাই করেছেন বাগান পরিচর্যার কাজ। জমি নিড়ানি থেকে শুরু করে চারা রোপন; কিংবা খুঁটি পোতা থেকে বাগান ঘেরা, সবই করেন এই তিন তরুণ।

তবে এক সময় তিন তরুণের পক্ষে বাগান পরিচর্যা করা সম্ভব হয়ে উঠছিল না। তখন তারা নিজেরা কাজ করার পাশাপাশি দিনপ্রতি তিনশ টাকায় একজন শ্রমিক নিয়োগ করেন। কিন্তু মাস শেষে সেই শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিতে না পারায় তিন তরুণ চাকরি নেন ঢাকায় পোশাক কারখানায়। সেই চাকরির বেতনের টাকায় শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিতে সক্ষম হন এই তরুণ উদ্যোক্তা।

পরে করোনা মহামারি দেখা দিলে চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফেরেন তারা। এরপর তারা আবার মন দেন বাগান করার দিকে। এরপর তাদের আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তারা এই বারোমাসি আমবাগান থেকে এখন প্রতি মাসে আয় করছেন প্রায় লাখ টাকা।

রুবেল মিয়া বলেন, ‘আগে থেকেই তিন বন্ধু মিলে একটা কিছু করব এমন ভাবনা ছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ১০ মার্চ আমরা তিন বন্ধু প্রথম আম বাগান করার সিদ্ধান্ত নেই। এরপর থাই কাটিমন জাতের চারা লাগানোর পরিকল্পনা করি।

‘চার বিঘা জমিতে প্রথমে পাঁচশ আম ও আড়াইশ পেঁয়ারার চারা রোপন করি। এরপর করোনার সময়টাতে গ্রামে ফিরে বাগান পরিচর্যায় লেগে পড়ি। এখন বাগানের আম-পেয়ারা বিক্রি করে পরিবারসহ নিজেরা ভালভাবে চলতে পারছি। আমরা এই বাগান করে এখন স্বাবলম্বী।’

আরেক উদ্যেক্তা মাসুদ রানা বলেন, ‘এই বাগান দাঁড় করতে যা ব্যয় হয়েছে তার জন্য আমরা কোনো ঋণ নিইনি। এটি দাঁড় করতে নিজেরাই পরিশ্রম করেছি। যার কারণে আমরা এখন ভালো ফল পাচ্ছি।’

তিনি বলেন, এ ধরনের বাগান যে কেউ চাইলে করতে পারবে। এই বাগান করে ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা নেই। কেননা, এই আম ঋতু ছাড়াও বারো মাসে পাওয়া যায়। আমরা পাইকারি দরে প্রতি মণ আম বিক্রি করছি ২০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ প্রতি কেজি আমের দাম পড়ছে পাঁচশ টাকা।’

জাহিদ হাসান জয় বলেন, ‘এখানে চার বিঘা জমিতে প্রায় সাড়ে সাতশ গাছ আছে। এগুলো হচ্ছে থাইল্যান্ডের থাই কাটিমন চারা। এই গাছ বছরে তিনবার ফলন দেয়। তবে প্রথম দেড় বছর উচ্চ ফলনের আশায় কোনো ফল নিইনি আমরা। গত চার মাস হলো ফল বিক্রি শুরু করি আমরা। এখন পর্যন্ত প্রায় পনেরো মণ আম বিক্রি করে তিন লাখ টাকা আয় করেছি আমরা।’

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি সিজনাল আমবাগান করার চেয়ে বারোমাসি আম বাগান করে লাভ বেশি হয়। কারণ অফ সিজনে দাম বেশি পাওয়া যায়।’

জয় জানান, আম ও পেয়ারা বিক্রি করে লাখ টাকা আয়ের পাশাপাশি তারা কলম কেটে বিক্রি করছেন গাছের চারাও। এক একটি আমের চারা বিক্রি হচ্ছে দুইশ টাকা। যা মাস শেষে আয়ের আরেকটি বড় অংশ যোগ হচ্ছে তাদের। এসব চারা তারা বিক্রি করছেন গাইবান্ধা ও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।

এ বিষয়ে ওই এলাকার সমাজসেবক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এলাকার এই তিন যুবক পলিটেকনিক্যাল থেকে ডিপ্লোমা শেষ করেছে। তাদের এ উদ্যোগে আমি খুশি। আমি নিজেও এ ধরনের বাগান করার পরিকল্পনা করছি। এটা এ অঞ্চলের প্রথমে আম বাগান যা বারোমাসই ফল দিচ্ছে।

‘আমি মনে করি, কৃষি বিভাগের এসব তরুণ উদ্যেক্তাদের পাশে এসে দাঁড়ানো দরকার। সরকার অনেককেই ভর্তুকি দিচ্ছে। সে রকম এদেরকে ভর্তুকি বা ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করা দরকার।’

সাদুল্লাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. খাজানুর রহমান বলেন, ‘ধাপেরহাটের তিনজন তরুণ উদ্যোক্তা পত্র-পত্রিকা দেখে বারোমাসি কাটিমন আমের চারা সংগ্রহ করে চুয়াডাঙ্গা থেকে। কৃষি বিভাগের কারিগরি সহায়তায় আজ তারা আম চাষে স্বাবলম্বী। এই বাগান থেকে তারা প্রতি সপ্তাহে ২০-২৫ হাজার টাকার আম বিক্রি করছে। উপজেলায় এ রকম আরও উদ্যোক্তা আমরা খুঁজছি।’

দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা