• বুধবার   ১২ মে ২০২১ ||

  • বৈশাখ ২৮ ১৪২৮

  • || ২৮ রমজান ১৪৪২

যে কারণে প্রতিদিনই মাছ খাওয়া জরুরি

দৈনিক গাইবান্ধা

প্রকাশিত: ১১ এপ্রিল ২০২১  

বাঙালির মাছ ছাড়া যেন তৃপ্তি করে খাওয়াই হয় না। এজন্যই বাঙালির পরিচয় মাছে-ভাতে বাঙালি। খুব একটা মিথ্যাও নয় এটি। মাছ খেতে ভালোবাসেন না এমন মানুষ কমই আছেন। এর স্বাস্থ্য উপকারিতা মাংসের চেয়ে অনেক বেশি। শরীর সুস্থ রাখতে মাছের জুড়ি নেই। এছাড়াও বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন যারা মাছ খান তাদের ত্বক অনেক ভালো থাকে। বার্ধ্যক্যের ছাপ পড়তে দেয় না ত্বকে।

পুষ্টিবিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরা বলেন, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কোনো না কোনো মাছ রাখা দরকার। কেননা মাছে রয়েছে হাজারো খাদ্যগুণ। নিয়মিত মাছ খেলে মস্তিষ্কের বিকাশ ভালো হয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত মাছ খান, তাদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ হারে কমে যায় মস্তিষ্কের বয়স। এ ছাড়া ছোটবেলা থেকেই মাছ খেলে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ভালো হয় বলে প্রচলিত আছে।  

১৯৭০ এর দশকে, ড্যানিশ গবেষকদের একটি দল দাবি করেছিল যে গ্রীনল্যান্ড উপকূলে বসবাসকারী ইনুইট জনগণের হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের মাত্রা ডেনমার্ক অধিবাসীদের তুলনায় কম ছিল।গবেষকরা দাবী করছেন, সুস্বাস্থ্যের পেছনে তাদের মাছের উপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা দায়ী।

এই প্রাণিজ প্রোটিনের উৎসে রয়েছে প্রচুর প্রোটিন, লো-ক্যালোরি আর ৯টি অ্যামিনো অ্যাসিড, যা হৃদরোগ, ক্যান্সার, হাড়ক্ষয়, ব্লাড প্রেসার, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস রোগের ঝুঁকি কমায়। বিকাশ ঘটায় মস্তিষ্কের, অথচ ক্যালোরি বাড়ায় না।শুধু তাই নয়,মন উৎফুল্ল রাখতেও মাছ কার্যকরী। তাই রোজ পাতে মাছ রাখলে তা শরীর মন উভয়কেই রাখবে সুস্থ আর প্রাণবন্ত।

মাছ মানেই প্রচুর প্রোটিন আর ৯টি অ্যামাইনো অ্যাসিডের সমাহার। প্রোটিন প্রতি কোষে পুষ্টি জোগায়, রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। অন্য প্রাণিজ প্রোটিনের মতো এতে খারাপ ফ্যাট থাকে না। ফলে কোলেস্টেরল বাড়ে না বরং মাছ থেকে মেলে ওমেগা-৩ ফ্যাট, যা 'মস্তিষ্ক খাদ্য' নামে পরিচিত।

ওমেগা-৩ ফ্যাট
সম্প্রতি মাছ ও মাছের তেলের উপকারিতা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। মাছের তেলে যে চর্বি রয়েছে , তা হলো অসম্পৃক্ত চর্বি। সাধারণভাবে বলা হয়, এটি ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের চমৎকার উৎস।  আজকাল এই ওমেগা-৩ ফ্যাট নিয়ে বেশ হইচই। এমনকি অনেকে নিয়মিত দোকান থেকে ওমেগা- থ্রি ফ্যাট ক্যাপসুল কিনে খান।

এই ওমেগা ৩ ফ্যাটের গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হলো ডিএইচএ। এটি রক্তনালিতে রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয়, রক্ত সরবরাহ নির্বিঘ্ন করে এবং রক্তের ক্ষতিকর চর্বিকে রক্তনালিতে জমতে বাধা দেয়। ফলে হৃদরোগ প্রতিরোধে এটি খুবই কার্যকর।তাছাড়া এর মধ্যে থাকা ট্রাইগ্লিসারিড কোলেস্টেরল বাড়তে দেয় না। সঙ্গে থাকা ৯টি অ্যাসিড শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও স্মরণশক্তি বাড়ায়।

জার্নাল মলিকিউলার নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড রিসার্চে প্রকাশিত সমীক্ষা মতে, নিয়মিত মাছ খেলে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। শরীরের জন্য উপকারী কোলেস্টেরল এবং ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের মাত্রা বাড়তে শুরু করে। ফলে হার্টের কোনও ধরনের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।

আমরা জানি, সম্পৃক্ত চর্বি হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। তেল-চর্বিযুক্ত খাবার তাই কম খাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু অসম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার খেতে বাধা নেই, বরং এটি রক্তের উপকারী চর্বির পরিমাণ বাড়ায় এবং আদতে উপকারই করে। কয়েক ধরনের ওমেগা- থ্রি ফ্যাট আছে প্রকৃতিতে। এর মধ্যে আলফা লিনোলিক অ্যাসিড পাওয়া যায় কিছু উদ্ভিজ্জ খাবার বা তেলে। ইকোসা প্যান্টনোয়েক অ্যাসিড এবং ডোকোসা হেক্সোনোয়েক অ্যাসিড পাওয়া যায় সামুদ্রিক খাবারে।

সামুদ্রিক মাছ
চিকিৎসক ও পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে মাংসের চেয়ে সামুদ্রিক মাছ খাওয়ার উপকারিতা বেশি। বস্তুত সামুদ্রিক মাছ মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষায় এক বিস্ময়কর উপাদান। যারা সামুদ্রিক মাছ বেশি খান তাদের স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা অনেকাংশে কম থাকে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই কমে যাওয়ার হার ৪০ শতাংশ। এছাড়া সামুদ্রিক মাছে রয়েছে প্রচুর সিলোনিয়াম যা অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে শরীরে কাজ করে ও বার্ধক্য প্রতিরোধ করে।

আমেরিকান জার্নাল অব সাইকোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, টানা ১ মাস সামুদ্রিক মাছ খেলে হার্টের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সেই সঙ্গে স্ট্রেস বা মানসিক চাপের কারণে হার্টের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও কমে।

মাছে থাকা ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড মূলত দুই ধরনের হয়। একটি হচ্ছে ই পি এ এবং আরেকটি ডি এইচ এ। সামুদ্রিক মাছে প্রচুর পরিমাণে ডি এইচ এ পাওয়া যায়। এটি রক্ত জমাট বাধতে সাহায্য করে ও দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে।  সামুদ্রিক মাছে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের পাশাপাশি ভিটামিন এ এবং ভিটামিন ডি প্রচুর পরিমাণে থাকে, যা একাধিক জটিল রোগকে দূরে রাখে।

এছাড়া মাছ নিয়ে আরও চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কৃত হচ্ছে। তাই মাছ ধীরে ধীরে আমাদের সবার দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

তবে এই মাছ খাওয়ার যেমন স্বাস্থ্যগত উপকারিতা আছে, তেমনি এই মাছে আছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। অতিরিক্ত মাছ খেলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সামুদ্রিক মাছের কিছু উপাদানের কারণে গর্ভাবস্থায় মাছ খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন অবস্থায় মাছের উপকারী উপাদানগুলোই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলেও বলছে বিভিন্ন গবেষণা ।  

দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা