• বুধবার   ০৮ জুলাই ২০২০ ||

  • আষাঢ় ২৪ ১৪২৭

  • || ১৭ জ্বিলকদ ১৪৪১

১৭

বাজেটে এবারও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে

দৈনিক গাইবান্ধা

প্রকাশিত: ৩০ মে ২০২০  

আসন্ন অর্থবছরের (২০২০-২১) বাজেটে কালো টাকাকে অর্থনীতির মূলধারায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে। মাত্র ১০ শতাংশ আয়কর দিয়ে জরিমানা ছাড়াই কালো টাকার অর্থের উৎস সম্পর্কে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কোনো প্রশ্ন করবে না। এছাড়া করপোরেট করদাতাদের এবং দেশের বন্ড বাজারকে চাঙ্গা করে তুলতে আসছে বিশেষ ছাড়। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আগামী ১১ জুন সংসদের জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল একটি ট্যাক্স ইনসেনটিভ প্যাকেজ ঘোষণা করবেন। চলমান কোভিড-১৯ মহামারি বিবেচনায় নিয়ে আসন্ন বাজেটে কোনো বাড়তি করের ভার জনগণের ওপর চাপাবেন না বলে জানা গেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, সংকট কাটাতে কালো টাকা অর্থনীতির মূল ধারায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা আছে বাজেটে। নতুন নতুন খাতে নির্দিষ্ট অঙ্কের কর দিয়ে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হবে। এর মধ্যে শেয়ারবাজার অন্যতম। চলতি বাজেটে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে শিল্প স্থাপনে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। মাত্র ১০ শতাংশ আয়কর দিয়ে কালো টাকা এই দুই খাতে বিনিয়োগ করলে অর্থের উৎস সম্পর্কে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কোনো প্রশ্ন করা হচ্ছে না। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত এ সুযোগ বহাল রয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনার কারণে বর্তমানে যেহেতু একটা সংকট তৈরি হয়েছে, তাই এখন কালো টাকার মালিকদের একটা সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে করোনা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, চিকিৎসা সহায়তাসহ প্রভৃতি কাজে এটা বিনা প্রশ্নে সাদা করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

এ বিষয়ে এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, এ মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির জন্য মূলধন দরকার। বিনিয়োগ বা যেকোনো ধরনের বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন। কাজেই এ অবস্থায় অপ্রদর্শিত টাকা (কালো টাকা) মূলধন জোগানের উৎস হতে পারে। বাজেটে এমন শর্ত দেওয়া যেতে পারে যে, বিদেশে পাচারকৃত টাকা দেশে আনলে কোনো প্রশ্ন করা হবে না, সেটা বৈধ বলে গণ্য করা হবে। বিদেশ থেকে টাকা আনলে সোর্স জিজ্ঞেস করা হবে না বললে হয়তো অনেকে দেশে টাকা আনবে। আরেকটি বিষয় দুর্নীতি দমন কমিশন উৎস খুঁজতে গিয়ে কাউকে হয়রানি করতে পারবে না এমন প্রভিশনও রাখতে হবে। অনেক সময় দুদক বা কর অফিস অপ্রদর্শিত আয় নিয়ে কথা বলতে পারে। সে জন্য শিথিলতা দেখিয়ে অপ্রদর্শিত আয় নিয়ে প্রভিশন যুক্ত করতে হবে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, দেশের অর্থনীতিতে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনা এখন অনিবার্য হয়ে গেছে। একটি শক্তিশালী চক্র প্রভাব কাজে লাগিয়ে মোটা হয়েছে। তারা এখন বাঁচতে পারছি না বলে আবার টাকা চাচ্ছে। যে টাকা সরিয়েছে তা রক্ষার জন্য এমনটি করছে। পাচারকৃত অর্থ এখন ফিরিয়ে না আনলে বৈষম্য আরও বাড়বে। গার্মেন্টের মালিকরা বলছেন টাকা নেই। বেতন দিতে পারছেন না। সরকারের কাছে টাকা চাচ্ছে; কিন্তু এত দিনের ব্যবসার আসল টাকা কই? প্রণোদনার জন্য যে টাকা সরকার দিচ্ছে সেটা তো জনগণের টাকা। কান টানলে নাক আসতেই হবে। বিদেশে টাকা রেখে মরে যাচ্ছি বলে আবার প্রণোদনা চাইবেন, এটা হবে না। এখনো সময় আছে টাকা দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। অর্থনীতিতে পাচার হওয়া টাকা নিয়ে আসা অনিবার্য। এ টাকা না আনা ছাড়া সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান হাবিব মনসুর বলেন, কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয় তত দিন বন্ধ হবে না যত দিন দেশে রাজনৈতিক নেতাদের চাঁদাবাজি ও সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি অব্যাহত থাকবে। এ টাকার পুরোটাই অনৈতিকভাবে উপার্জিত। ওই টাকা যদি অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে একটি অনৈতিকতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। তবে যেসব ব্যবসায়ী বৈধ উপায়ে উপার্জন করেছেন; কিন্তু সেই টাকার কর দেননি চাইলে ওই টাকা অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করা যেতে পারে।

দেশের অন্যতম তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী ও বিকেএমইএর জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যারা পাচার করেছে তারা নিজের এবং স্ত্রী-সস্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতেই পাচার করেছে। বাড়ি-গাড়ি করেছে বিদেশে। সরকার চাইলে আইনি প্রক্রিয়ায় এ অর্থ ফিরিয়ে আনতে পারে। তবে এর কোনো রেকর্ড নেই। যারা পাচার করেছে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই পাচার করেছে। তবে অর্থ পাচারকারীদের কিছু ব্যবসায়ী থাকলেও অধিকাংশই অব্যবসায়ী। তাদের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি লোক রয়েছে। আমলাদের একটা বড় অংশের ইউরোপ এবং আমেরিকায় বড় বড় বিনিয়োগ রয়েছে। তাদের দেশের মানুষ চেনে এবং জানে। সরকার উদ্যোগ নিলেই দেশের ক্রান্তিকালে পাচার হওয়া অর্থের বড় একটা অংশ ফিরিয়ে আনতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, কালো এবং পাচারের টাকা অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসতে আগেও কয়েকবার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করা যাবে। কিন্তু কোনো বারই তাতে সাড়া পাওয়া যায়নি। তার মানে হলো, যারা কালো টাকার মালিক তারা এক টাকা কর দিয়েও কালো টাকা সাদা করতে চান না। করোনার কারণে বর্তমানে যেহেতু একটা সংকট তৈরি হয়েছে, তাই তিনি মনে করেন, এখন কালো টাকার মালিকদের একটা সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে নতুন কোনো পন্থা বের করতে হবে। যেমন করোনা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, চিকিৎসা সহায়তাসহ প্রভৃতি কাজে এটা বিনা প্রশ্নে সাদা করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। আবার এসব কাজে কেউ কালো টাকা দান করলেও তা সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত হবে- এমন ঘোষণাও সরকারকে দিতে হবে।

অর্থনীতিবিদ এবং আয়কর আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কালো টাকা বলতে সে সম্পদ বা আয়কে বোঝায় যে সম্পদ বা আয়ের বিপরীতে কর প্রদান করা হয়নি? কিন্তু এর আবার দুটি ভাগ আছে। একটি হলো বৈধভাবে উপার্জিত, আরেকটি অবৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ।

তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, 'আইনে কালো টাকা হলো অপ্রদর্শিত আয়। যে আয়ের কর দেওয়া হয়নি। সে আয় বৈধ এবং অবৈধ দুটোই হতে পারে। কিন্তু এনবিআর আয়কর নেওয়ার সময় আয়ের উৎস জানতে চায় না। এখানে আয় বৈধ না অবৈধ সেটা আলাদা করার সুযোগ নেই। তবে খরচের খাত যখন দেখানো হয় তখন তার আয়ের উৎস বলতে হয়। এটি আয়কর দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

এদিকে বাংলাদেশে কালো টাকার পরিমাণ কত তা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ের কোনো গবেষণা নেই। বিশ্বব্যাংক ২০০৫ সালের এক গবেষণায় বলছে, ২০০২-০৩ সালে বাংলাদেশে কালো টাকার পরিমাণ ছিল মোট জিডিপির ৩৭ দশমিক সাত ভাগ?

অন্যদিকে ২০১১ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় কালো টাকা নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশে ২০১০ সালে কালো টাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির ৬২.৭৫ ভাগ, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। গবেষণায় আরও বলা হয়, ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত গড়ে কালো টাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির ৩৫.৬ ভাগ। আর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে কালো টাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির মাত্র ৭ ভাগ। বিশ্বব্যাংক অবৈধ আয়ের যে কালো টাকা, তার উৎস হিসেবে মাদক ব্যবসা, অবৈধ ব্যবসা, ঘুষ ও দুর্নীতিকে চিহ্নিত করেছে?

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, 'কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ, সেখানে এই সুযোগ দেওয়ার পর কী করা হবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা উচিত। যারা এ সুযোগ নেননি তাদের বিরুদ্ধে অতীতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে কালো টাকা যে খুব বেশি সাদা হয়েছে তা বলা যাবে না। আর যারা সাদা করেননি তারা যেকোনো ব্যবস্থার মুখে পড়েছেন বা তাদের কালো টাকার ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এমনটি কখনো দেখা যায়নি। তিনি বলেন, 'বিভিন্ন সময়ে মোট ১৭ হাজার কোটি কালো টাকা সাদা হওয়ার একটা রেকর্ড আছে। তবে তার মধ্যে ১১ হাজার কোটি টাকা সাদা হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে।

 

দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা
জাতীয় বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর