• বুধবার   ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||

  • আশ্বিন ১৫ ১৪২৭

  • || ১২ সফর ১৪৪২

১৫

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা বিনামূল্যে ফসলের বীজ-চারা পাবেন

দৈনিক গাইবান্ধা

প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০২০  

চলতি মৌসুমের বন্যা দীর্ঘায়িত হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার কৃষকরা। বানের পানিতে ভেসে যাচ্ছে ফসল। কোথাও পানিতে ডুবে আউশ-আমনসহ বিভিন্ন ধরনের সবজিও নষ্ট হয়ে গেছে। ঘরে চাল থাকলেও রান্না করে খাওয়ার মতো সবজি নেই, এমনকি বাড়ির আঙিনার সবজিসহ সব কেড়ে নিচ্ছে বন্যায়। এমন পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে দ্রুত ফসল পেতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার কৃষকদের বিনামূল্যে দ্রুত বর্ধনশীল শাক-সবজির বীজ দেবে কৃষি মন্ত্রণালয়। যাতে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার ১৫-২০ দিনের মধ্যেই ফসল উঠিয়ে ভাতের সঙ্গে নিজেরা খেতে পারেন। ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের বন্যা আক্রান্ত ৩৮ জেলার লাখো কৃষকদের এই বীজ ও বীজ দিয়ে সহায়তা করা হবে বলে জানা গেছে। সব ডুবে নষ্ট হওয়ার ফলে বাড়ির আঙিনায় দ্রুত উৎপাদিত এই ফসলই কৃষকদের সাময়িকভাবে শাক-সবজির চাহিদা মেটাবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) তথ্য কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত বন্যায় ৩৮ জেলার ১ লাখ ৮৩ হাজার হেক্টর জমির ১৬-১৭টি ফসল আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে আউশ ও আমন ধানের পরিমাণই সবচেয়ে বেশি। এরপরে বিভিন্ন শাক-সবজি তো আছেই।

কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, কৃষকদের নানাভাবে সহায়তা করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সার বীজসহ রোপা আমনে চারাও তৈরি করে দেয়া হবে। তবে বন্যার পানি নেমে গেলে আক্রান্ত এলাকার মানুষ নিজেদের খাওয়ার জন্য কোন শাক-সবজি পাবে না। এমনকি আক্রান্ত এলাকায় কোন সবজি কিনেও পাওয়া যাবে না। কেননা যারা বিভিন্ন শাক-সবজি উৎপাদন করে বিপণন করে তাদেরও ক্ষতি হয়েছে। ফলে কৃষকদের নিজেদের সঙ্কট মেটাতে পাশাপাশি কিছুটা বিক্রি করতে অতি দ্রুত যে সকল ফসল উঠানো যায় সে ধরনের শাক-সবজির বীজ বিনামূল্যে দেবে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হর্টিকালচার উইং ও কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, দ্রুত বর্ধনশীল শাক-সবজি উৎপাদনে বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে এই সহায়তা করা হবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের। যাতে একজন কৃষক বন্যার পানি নেমে গেলে ১৫ দিনের মধ্যেই বিভিন্ন জাতের শাক উৎপাদন করে খেতে পারে। এছাড়াও জমিতে জো আসার এক মাসের মধ্যেই যেন বিভিন্ন সবজি উঠিয়ে নিজেদের চাহিদা মেটাতে পারে। বেশি আবাদ হলে স্থানীয় বাজারে কিছুটা বিক্রিও করতে পারবে। আর অন্যান্য ফসলে মন্ত্রণালয় যে সহায়তা করবে তা দীর্ঘমেয়াদী হিসেবে সহায়তা দেয়া হবে। আর এই সহায়তা আপদকালীন হিসেবে কৃষকদের দেয়া হবে। এর জন্য সরকারের ব্যয় হবে ১৭ কোটি টাকা। ইতোমধ্যেই বন্যার পানি নেমে গেলে দ্রুত ফসল উৎপাদন করতে বীজ বিতরণ করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে আক্রান্ত জেলাগুলোতে।

কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, এই সহায়তা একজন কৃষক বীজ পেয়ে দ্রুতই তার বাড়ির আঙিনার জমিতে লাগিয়ে দেবে এবং ১৫-২০ দিনের মধ্যেই শাক উৎপাদন হবে। সবজি পেতে আরও ১০-১২ দিন বেশি লাগবে। নিজেদের চাহিদা মেটাবে।

কৃষি সচিব নাসিরুজ্জামান জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা ইতোমধ্যেই এই দ্রুত ফসল ফলাতে বরাদ্দ দিয়েছি। এটা হবে দুই রকম। একটা শাক জাতীয় যেটা ১৫-২০ দিন বা তার আগেই কৃষক উৎপন্ন করে নিজেদের চাহিদা মেটাবে। যেমন লালশাক জো আসলে এই শাক দ্রুত হবে। এছাড়াও পুঁইশাক, কলমিশাক, পাটশাক। এটা কৃষকদের নিজেদের খাওয়ার জন্য এই কারণে কৃষকদের সব ডুবে গেছে। ঘরে চাল থাকলেও ভাতের সঙ্গে খাওয়ার কিছু নেই তাই দ্রুত নিজেদের খাওয়ার জন্য এটি করা হবে। আরেকটি হলো- যারা সবজি বিক্রি করে তাদের সংসার চালান, তাদের সবজির মাচা এখন খালি। অর্থাৎ গাছের গোড়ায় পানি ওঠাতে সব গাছ মরে গেছে। তাদের মাচা আবার সবজিতে ভরিয়ে দেব আমরা। যেমন হাইব্রিড করলা ১ মাসের মধ্যেই ফলন আসে, হাইব্রিড শশা, হাইব্রিড বরবটি, লাউ। কিছু কিছু কলাবাগান নষ্ট হয়েছে। এজন্য কিছু কলার চারা বিতরণ করব। মরিচের চারা তৈরি করছি আমরা এসব চারাও বিতরণ করব। কৃষি সচিব আরও বলেন, আমরা কৃষকদের সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছি আরও দেব। এই সহায়তা দ্রুততম পদক্ষেপ হিসেবে। সচিব বলেন, বন্যায় প্রথম বারের যে ক্ষতি হয়েছে এটা প্রতিবছরই আমরা ধরে কিছু বাড়তি বীজতলা তৈরি করি। আমাদের বোনা আমনে কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। ২৫ জুন থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত প্রথম ক্ষতি আমরা সবসময় হিসেবের মধ্যে রেখে প্রস্তুতিও থাকে। পরের বন্যায় আমাদের সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে বোনা আমন। রোপা আমনে যে বীজতলা নষ্ট হয়েছে আমরা বীজ তৈরি করে দিতে পারব তবে বোনা আমনে কিছু দেয়ার নেই। তাই বোনা আমনে ক্ষতিগ্রস্তরা যে যা করতে যায় কেউ সরিষা, মাসকলাই, কেউ গম করবে অর্থাৎ আগাম রবি ফসল হিসেবে যে যা করবে আমরা সহায়তা করব।

জানা গেছে, দ্রুত বর্ধনশীল শাক-সবজি উৎপাদন হিসেবে কৃষক তার পছন্দ মতো যে কোন ফসল আবাদের বিষয়টিও রাখা হয়েছে সরকারী আদেশে। এছাড়াও স্থানীয়ভাবে যেন কৃষকদের হাইব্রিড সংগ্রহ করে দেয়া হয় সেটিও আদেশে বলা হয়েছে। কৃষকের পছন্দকে প্রাধান্য দেয়ার কারণ হিসেবে জানা গেছে, সব এলাকায় সব ধরনের ফসল হয় না বলে যে এলাকায় যে ফসল বা শাক-সবজি দ্রুত হয় কৃষকরা সেটিই যেন করতে পারে এজন্য কৃষকদের পছন্দের বিষয়টি রাখা হয়েছে। আর কৃষি বিভাগ কৃষকদের পছন্দ মতো বীজ বিতরণ করতে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা ইতোমধ্যেই মন্ত্রণালয় তৈরি করেছে। আর সে হিসেবেই এই সহায়তা দেয়া হবে বলে জানা গেছে। কৃষি সচিব জানান, যারা বড় কৃষক তাদের অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছে তবে এই মুহূর্তে এক বিঘা হিসেবে সিলিং করা হয়েছে যাতে সবাই পায়। বন্যার কারণে খাদ্যে কোন সমস্যা হবে না বলেও মনে করেন কৃষি সচিব।

ডিএই জানিয়েছে, বন্যায় ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে আমনের চারা বিতরণ করা হবে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কোন এলাকায় যদি আমন চাষ সম্ভব না হয়, এদিকে বন্যায় কৃষকের ক্ষতি পোষাতে কৃষি কর্মকর্তাদের দ্রুত বন্যা প্লাবিত এলাকায় সরেজমিনে মাঠ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেছেন, চলমান বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা চরম অনিশ্চয়তায় আছেন। বন্যার পানি নেমে গেলে জরুরী ভিত্তিতে কৃষি পুনর্বাসন ও ক্ষতি কমাতে কাজ করা হবে।

জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে ২৫ জুন থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত বন্যায় ১১টি ফসলের প্রায় ৭৬ হাজার ২১০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪১ হাজার ৯১৮ হেক্টর জমি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টাকার অঙ্কে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৪৯ কোটি টাকা। মোট ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৩ লাখ ৪৪ হাজার জন। তবে কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দ্বিতীয় ধাপে ৩৮টি জেলার বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ এখনও নিরূপণ করা না হলেও ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে কৃষক এবার সবজি আবাদে মার খেয়েছেন। মৌসুমি ফল চাষেও ভাল দাম পাননি। সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় আমফানের ক্ষতির রেশ কৃষক এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এর মধ্যে বন্যার ধাক্কা কৃষকের জন্য সামলে ওঠা কঠিন হবে। এই মুহূর্তে সরকারের সহযোগিতায় আবারও কৃষক ঘুরে দাঁড়াবে মনে করেন অনেকেই।

দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা
জাতীয় বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর