• মঙ্গলবার   ০৭ জুলাই ২০২০ ||

  • আষাঢ় ২৩ ১৪২৭

  • || ১৬ জ্বিলকদ ১৪৪১

১৮

ফেসবুক থেকে সরল কোকা–কোলাও, বর্জনের কারণটা কী

দৈনিক গাইবান্ধা

প্রকাশিত: ২৭ জুন ২০২০  

ঘৃণ্য বক্তব্যের বিরুদ্ধে ফেসবুক কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় এ প্ল্যাটফর্ম থেকে বড় বড় বিজ্ঞাপনদাতারা সরে যাচ্ছে। ফেসবুক বর্জনের ডাক দিয়ে চালু করা আন্দোলন ‘#স্টপহেটফরপ্রফিট’ জোরদার হচ্ছে। ফেসবুক থেকে বিজ্ঞাপন বর্জনের তালিকায় নাম লিখিয়েছে কোকা–কোলার মতো ব্র্যান্ড।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে জানানো হয়, গতকাল শুক্রবার কোকা–কোলার পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় যে তারা অন্তত ৩০ দিন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেবে না। ফেসবুকে বর্ণবাদী কনটেন্ট নিয়ে বর্তমান অবস্থান ঘিরে সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

কোকা–কোলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান জেমস কুয়েন্সি বলেন, ‘বিশ্বে বর্ণবাদের কোনো স্থান নেই এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও এর জায়গা নেই। সামাজিক যোগাযোগের কোম্পানিগুলোকে আরও বেশি দায়িত্বশীল ও স্বচ্ছ হতে হবে। কোকা–কোলা বিজ্ঞাপন বন্ধ করে বিজ্ঞাপন নীতিমালা পর্যালোচনা করবে।
অবশ্য মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে কোকা–কোলার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ফেসবুক থেকে বিরতি নিলেও গত সপ্তাহে আফ্রিকান–আমেরিকান সিভিল সোসাইটি গ্রুপের চালু করা আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছে না।


কোকা–কোলা ছাড়াও ইউনিলিভার তাদের বেশ কিছু পণ্যের বিজ্ঞাপন ফেসবুকে বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এ বছরে তারা ফেসবুক, টুইটার ও ইনস্টাগ্রামে বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করবে না।

গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে ফেসবুকের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়াছাড়ির কথা জানিয়েছে ভাইবার কর্তৃপক্ষ। তারা বলেছে, ভাইবার অ্যাপ থেকে ফেসবুক কানেক্ট, ফেসবুক এসডিকে এবং গিফি সরিয়ে দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি ফেসবুক নেটওয়ার্ক প্ল্যাটফর্মে সব ধরনের বিজ্ঞাপন স্থগিত করবে ভাইবার। জাপানের রাকুটেনের মালিকানাধীন ভাইবারের পূর্ব ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার বৃহত্তম বাজার রয়েছে।

ভাইবারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা ফেসবুক বয়কট করার জন্য আন্দোলনও করবে। এ ক্ষেত্রে তারা যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক আন্দোলনের পর গঠিত অ্যান্টিডিফেমেশন লিগ, এনএএসিপিসহ ছয়টি সংস্থার সঙ্গে কাজ করবে। সংস্থাগুলো ঘৃণ্য বক্তব্য বা ‘হেট স্পিচ’ থেকে ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ফেসবুক প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন বয়কটের আহ্বান করছে।

ভাইবার জানিয়েছে, তথ্য অব্যবস্থাপনার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটিয়েছে ফেসবুক। এর মধ্যে রয়েছে আলোচিত কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি, যাতে ৮ কোটি ৭০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য বেহাত হয়েছিল। সর্বশেষ ফেসবুক থেকে ঘৃণিত বক্তব্য ছড়ানোর বিষয়টি ভাইবারের নজরে আসায় তারা #স্টপহেটফরপ্রফিট আন্দোলন জোরদার করবে। এ কারণে তারা ফেসবুক প্ল্যাটফর্ম ছাড়ছে।

ভাইবারের প্রধান নির্বাহী জ্যামেল অ্যাগাউয়া বলেছেন, বর্তমান বিশ্বের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ফেসবুক নিজেদের দায়িত্ববোধ, অবস্থান ও মনোভাব প্রকাশে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তথ্য অব্যবস্থাপনা ও অ্যাপে ব্যবহারকারীদের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যর্থ হওয়া থেকে শুরু করে সহিংসতা ও বিপজ্জনক উদ্ধৃতি থেকে মানুষকে সুরক্ষা দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিয়ে ফেসবুক চরমভাবে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। সত্য হচ্ছে, ফেসবুকে সহিংস কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ায় কিছু মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে আর তাই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিক ও স্পষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্বিক পরিস্থিতিতে চাপে পড়েছে ফেসবুক। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এখন থেকে সম্ভাব্য ক্ষতিকর পোস্টে তারা বিশেষ লেবেল বা বার্তা লাগিয়ে দেবে। তবে সংবাদ হিসেবে গুরুত্ব থাকায় তা ছেড়ে দিতে হবে তাদের।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পোস্টসহ সামাজিক যোগাযোগের প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট ব্যবস্থাপনা নিয়ে চাপ তৈরি হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৯০ টির বেশি প্রতিষ্ঠান ফেসবুকে বিজ্ঞাপন বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছে।

ইউনিলিভার ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের ফোন কোম্পানি ভেরিজন ফেসবুক ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ অবশ্য তাঁর বক্তব্যে তাঁর কোম্পানি ঘৃণ্য বক্তব্য সরিয়ে দেওয়ার রেকর্ড তুলে ধরেছেন। তিনি এ মাসে ইউরোপিয়ান কমিশনের একটি প্রতিবদেন তুলে ধরেন, যাতে বলা হয়েছে যে গত বছর ফেসবুক ৮৬ শতাংশ ঘৃণ্য বক্তব্য সরিয়েছে, যা আগে ছিল ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ। তিনি ফেসবুক থেকে বর্ণবাদী বিজ্ঞাপন দেওয়ার সুযোগ না রাখা ও নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন রাজনৈতিক বক্তব্য সরিয়ে ফেলারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

অবশ্য বিজ্ঞাপনদাতারা বলছেন, তাঁরা আর জাকারবার্গকে বিশ্বাস করেন না। এর আগে এমন অনেক প্রতিশ্রুতি তিনি রাখেননি।

এ মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদকারীদের নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্যের বিষয়ে ব্যবস্থা না নেওয়ায় নানা চাপে ছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ। এই চাপের মুখে ফেসবুকের নীতিমালা পুনর্মূল্যায়নের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাছে চিঠি লিখে নীতিমালা পর্যালোচনার কথা জানান।

গত ২৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েড নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি নিহত হওয়ার প্রতিবাদে দেশজুড়ে সহিংস বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফেসবুক, টুইটারে পোস্ট দেন, ‘লুটপাট শুরু হলে গুলিও শুরু হবে’। ট্রাম্পের এই বিতর্কিত পোস্ট সারা দেশে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করে।

গণ-অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় টুইটার কর্তৃপক্ষ ট্রাম্পের ওই পোস্ট ঢেকে দেয়। তবে আরেক প্রযুক্তি জায়ান্ট ফেসবুক ট্রাম্পের ওই পোস্টের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বিষয়টি নিয়ে নানা মহল যখন কঠোর সমালোচনায় মত্ত, তখন জাকারবার্গ ওই সময় বলেছিলেন, ফেসবুক ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পোস্ট অপসারণ বা ঢেকে দেবে না। এটা তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নীতিমালার সঙ্গে যায় না।

প্রধান নির্বাহী জাকারবার্গের এমন বক্তব্যে হতাশ হন স্বয়ং তাঁর প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। তাই ট্রাম্পের বিতর্কিত ওই মন্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় জাকারবার্গের প্রতি ক্ষোভ জানিয়ে অনেক কর্মী কর্মবিরতি পালন করেন।

জর্জ ফ্লয়েড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে একের পর এক বেফাঁস মন্তব্য করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এগুলো ঢেকে দিতে বা মুছে ফেলতে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে দাবি জানানো হয় বিভিন্ন মহল থেকে। কিন্তু তখন জাকারবার্গ পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারেননি। এখন সেই ধাক্কাই এসে লেগেছে ফেসবুকের ওপর।

গতকাল ফেসবুক ও টুইটারের শেয়ারের দাম ৭ শতাংশ পর্যন্ত পড়তে দেখা গেছে।

দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর