• রোববার   ০১ নভেম্বর ২০২০ ||

  • কার্তিক ১৬ ১৪২৭

  • || ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ঢাকা–আঙ্কারা সম্পর্কে সুবাতাস

দৈনিক গাইবান্ধা

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০  

পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের তুরস্ক সফরের মধ্যে দিয়ে ঢাকা-আঙ্কারা সম্পর্কে  সুবাতাস বইছে। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঘিরে দুই দেশের মধ্যে অনেক দিন ধরে টানাপোড়েন চললেও এখন তা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে। আর সে কারণেই আগামী বছর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান ঢাকায় আসতে সম্মতি দিয়েছেন।

বাংলাদেশের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক সবসময় ভালো থাকলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঘিরে ২০১০ সালের পর থেকে টানাপোড়েন শুরু হয়। পরবর্তী ছয় বছর চরমভাবে সেই টানাপোড়েন চলতে থাকে। এরপর দুই দেশের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যায় তুরস্ক। ২০১২ সালে তুরস্কের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানকে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছিলেন। তবে সেই অনুরোধ রাখেননি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট।

২০১৬ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতা মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি হলে ঢাকায় নিযুক্ত তুরস্কের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত ডেভরিম ওজতুর্ককে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। যদিও ঢাকার তুরস্ক দূতাবাস সে সময় তাকে প্রত্যাহারের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ঘটনা অস্বীকার করে। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমকে কঠোর শাস্তি না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে তুরস্কের সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদ গুল বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। এসব ঘিরে ঢাকা-আঙ্কারা সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়েছিলো।

পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন গত ১৩-১৬ সেপ্টেম্বর তুরস্ক সফর করেন। যদিও পররাষ্ট্র মন্ত্রী আঙ্কারার বাংলাদেশ দূতাবাসের নতুন ভবন উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন। তবে তুরস্ক সফরকালে দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের সঙ্গে তিনি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। একই সঙ্গে তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মেভলুত চাভাসগুলুর সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া আঙ্কারার বাংলাদেশ দূতাবাসের নতুন ভবন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সে দুই দেশের সরকার প্রধান বক্তব্য দেন। তারা আগামীতে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বাড়াতে আশা প্রকাশ করেন।

শীতল সম্পর্কের মধ্যেও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তুরস্ক বরাবরের মতোই বাংলাদেশের পাশে ছিলো। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রস্তাবও তুলেছে তুরস্ক। যে কারণে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখার জন্য তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোগান ও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রী মেভলুত চাভাসগুলুর ঢাকায় আসেন। সে সময় তারা রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পও পরিদর্শন করেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকে প্রেসিডেন্ট এরদোগান ২০২১ সালের শুরুতে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে এরদোগানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশ-তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান শুল্কবাধা এড়িয়ে নতুন পণ্য, বস্ত্র, ওষুধ ও অন্যান্য খাতের বিনিয়োগ। এছাড়া উভয় দেশের বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। বাংলাদেশে তুরস্কের আর্থিক সহযোগিতায় একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের প্রয়োজনীয় জমি বরাদ্দের জন্য তুরস্কের প্রেসিডেন্ট প্রস্তাব দেন। তুরস্ক দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সকল বিষয়ে তিনি বাংলাদেশের পাশে থাকবেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়া বিদ্যমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে  প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

করোনা চলে গেলে ঢাকায় নব নির্মিত তুরস্কের দূতাবাস ভবন উদ্বোধনের জন্য বাংলাদেশ সফরে আসার কথা জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট এরদোগান।

আঙ্কারার বাংলাদেশ দূতাবাসের নতুন ভবন উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রায় ৫০ বছর আগে ১৯৭৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে তুরস্কের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু হয়। পারস্পরিক আস্থা-বিশ্বাসে ইতিহাস, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে দু’দেশের সম্পর্কের শিকড় অনেক গভীরে।

দু’দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দু’দেশের জনগণের দ্বিপক্ষীয় সুবিধার জন্য সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে আগ্রহী বাংলাদেশ। তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে থাকার জন্য তুর্কি জনগণ ও দেশটির সরকারকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তুরস্ক থেকে ফিরে আসার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন জানিয়েছেন, আগামী দিনে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা আরও বাড়বে।

তিনি আরও বলেন, উভয় দেশের জনগণ মুসলিম হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের মিল রয়েছে। আমরা উভয় দেশই বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালে তুরস্কের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে দেশ সফর করেন। এছাড়া ২০১৭ সালে ওআইসির বিশেষ সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্ক সফর করেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ। সে সময় তিনি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সঙ্গে বৈঠক করেন।

দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা