• শুক্রবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||

  • আশ্বিন ৯ ১৪২৭

  • || ০৭ সফর ১৪৪২

৮১

`আমার জীবনের সব তছনছ হয়ে গেছে`

দৈনিক গাইবান্ধা

প্রকাশিত: ২১ আগস্ট ২০২০  

'দেখতে দেখতে ১৬ বছর পার হয়ে গেল। ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার সেই দিনটির কথা এখনও স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে। সেদিন জঙ্গিবিরোধী শান্তি সমাবেশে হঠাৎ গ্রেনেডের ছোবল অশান্তি বয়ে এনেছিল আমার মতো অনেকের জীবনেই। এক গ্রেনেড হামলায় আমার জীবনের সবকিছু তছনছ হয়ে গেছে।' কথাগুলো বলছিলেন ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শান্তি সমাবেশে ইতিহাসের নৃশংসতম গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত সাবেক এমপি ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক মহিলা বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট উম্মে রাজিয়া কাজল। আলাপকালে সেদিনের বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার স্মৃতিচারণের পাশাপাশি তার প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

উম্মে রাজিয়া কাজলের ভাষায়, বর্তমানে একরকম জীবন্মৃত হয়ে দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছেন তিনি। তারপরও একটিই চাওয়া তার জীবনে- যারা এই ঘৃণ্য ও নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের যথোপযুক্ত শাস্তি হোক। বিচারিক আদালতে এই মামলার বিচারের রায়ে মূল হোতাদের অনেকের ফাঁসির রায় হয়েছে, যাবজ্জীবন সাজাও হয়েছে। এই রায়ে সন্তুষ্ট তিনি। এখন তার চাওয়া এটাই, এই রায়টা যেন হাইকোর্টেও বহাল থাকে। রায়টা যেন কার্যকর হয়, সেটা যেন দেখে যেতে পারেন তিনি। তিনি বলেন, এ দেশে দীর্ঘ সময় পরও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসি হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও তাদের ফাঁসির রায়ও কার্যকর হচ্ছে। তাই যত সময়ই লাগুক, প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা গ্রেনেড হামলাকারীদেরও বিচার করবেন। এই বিশ্বাস নিয়েই এখনও বেঁচে রয়েছেন তিনি।

সেদিনের দুঃসহ স্মৃতির কথা তুলে ধরে কাজল জানান, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের সমাবেশে স্থাপিত ট্রাকের খুব কাছাকাছি জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। সামনেই বসা ছিলেন সেদিনের ঘটনায় নিহত আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ অন্য নেতারা। বিকেল ৫টা ২১ মিনিটে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ হওয়া মাত্রই ভয়ঙ্কর শব্দে প্রথম গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটে। সেই গ্রেনেডের স্প্লিন্টার বৃষ্টির মতো ছিটে এসে তার বাঁ পায়ে আঘাত হানে। এতে পায়ের তালু ও আঙুলগুলো কুঁকড়ে যায়। প্রচণ্ড ব্যথার সঙ্গে তিনি প্রথমে পা ও পরে হাত দিয়ে চেষ্টা করছিলেন কুঁকড়ে যাওয়া তালু সোজা করতে।

রাজিয়া কাজল বলেন, এরপরই একটার পর একটা গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটতে শুরু করে। বিকট শব্দে তখন কাঁপতে থাকি। গ্রেনেডের স্প্লিন্টার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করছিল। দেখতে না দেখতেই চারদিক প্রচণ্ড ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। মানুষের চিৎকার-চেঁচামেচি আর আর্তনাদে এক বীভৎস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় সেখানে। সেই অবস্থায়ই দেখার চেষ্টা করি, নেত্রী (শেখ হাসিনা) কোথায়। দেখতে পাই, নেত্রী নিচু হয়ে বসে আছেন। আর দলের নেতারা তার চারপাশ ঘিরে অনেকটা মানবঢাল গড়ে তুলেছেন।

সাবেক এই এমপি বলেন, এ সময় কীভাবে জানি না পিছিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের বাটার দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ি। এক সময় পেছন থেকে হঠাৎ গুলির আওয়াজ পাই। পেছন ঘুরে দাঁড়িয়ে পড়ি এটা ভেবে যে, যদি গুলিতে মরতেই হয় তা হলে যেন পিঠে নয়, বুকেই গুলি লাগে। এক সময় গুলির শব্দ থামলেও মাথা প্রচণ্ড ঘুরতে শুরু করে। বাবা-মা আর সমাবেশে যোগ দিতে আসার সময় বাসায় রেখে আসা মেয়ে, ছোট ছেলে আর ছোট চাচাতো ভাইয়ের কথা মনে পড়ছিল। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলাম, মৃত্যুর আগে যেন ওদের দেখে যেতে পারি।

রাজিয়া কাজল জানান, এরপর আর কিছু মনে নেই তার। অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। পরে শুনেছেন আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের প্রবেশপথে পড়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া যায় তাকে। প্রাণ বাঁচাতে অনেক মানুষ তাকে মাড়িয়েই ছোটাছুটি করে চলে যেতে থাকে। এরই মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক লীগের তৎকালীন আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সাইমুম সরওয়ার কমলসহ কয়েকজন নেতাকর্মী তাকে উদ্ধার করে সামনের দিকে নিয়ে যান। এ সময় তিনি কিছুটা হুঁশ পান এবং ওই অবস্থায়ই বারবার নেত্রী শেখ হাসিনা আর আইভি রহমানের অবস্থা জানতে চান। আইভি রহমান তখনও সেখানে আহত অবস্থায় পড়ে ছিলেন। নেতারা তাকে দেখার সুযোগ করে দেন সাবেক এই এমপিকে।

চারদিকে তখন রক্তের বন্যা বইছে। ট্যাক্সিক্যাবে করে নেতাকর্মীরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে আরও অনেক আহত মানুষের ভিড়ে কোনো জায়গাই ছিল না। তাকে তাই প্রথমে লাশের স্তূপের কাছে রাখা হয়। কিন্তু অনেকক্ষণ কোনো ডাক্তার-নার্স না পাওয়ায় বাইরে এনে একটি ভ্যানে শুইয়ে রাখা হয়। পরে ওই ভ্যানে করেই তাকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাত ৯টা পর্যন্ত চিকিৎসার পর নেতারা তাকে চাদর দিয়ে ঢেকে ও লুকিয়ে ট্রমা সেন্টারে নিয়ে যান। কেননা প্রকাশ্যে নিয়ে গেলে পুলিশের হয়রানির মুখে পড়ার ভয় ছিল। ২৪ আগস্ট পর্যন্ত ট্রমা সেন্টারে রেখে চিকিৎসার পর বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয় তাকে। পরে ৪ সেপ্টেম্বর ভারতের কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালে গিয়ে একমাস চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফেরেন তিনি।

এখন কেমন আছেন?- এমন প্রশ্নের জবাবে যন্ত্রণাকাতর মুখে কাজল বলেন, গত ১৬ বছরে দেশ-বিদেশে বহুবার চিকিৎসা নিয়েছেন তিনি। এসব চিকিৎসার পর শরীর থেকে মাত্র ৩৭টি স্প্লিন্টার বের করা গেছে। এখনও তিনশ'রও বেশি স্প্লিন্টার রয়েছে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে। অনেক স্প্লিন্টার শিরার মধ্যেও ঢুকে গেছে। এই কারণে তার শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো নেই। শরীরের ভেতরে থাকা এসব স্প্লিন্টারের কারণে সব সময় প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া, কামড়ানো এবং টাটানোর যন্ত্রণা হয় তার। এই যন্ত্রণা দিন দিন বাড়ছেই, যা বলে বোঝানোর নয়। একমাত্র ভুক্তভোগীই বুঝবেন এ যন্ত্রণার কথা।

রাজিয়া কাজল বলেন, 'শরীরে এত ব্যথা যে কোনো কুলকিনারাও পাই না। আগে ছিল এক পায়ে ব্যথা। এখন দু'পায়েই হয়। স্প্লিন্টারবিদ্ধ বাঁ পায়ের কার্যক্ষমতা প্রায় লোপ পেয়েছে। এখন ডান পায়েও ব্যথার কারণে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারি না। কোর্টে যেতে পারি না। ওষুধ খেয়ে ব্যথা কিছু সময়ের জন্য কমে, পরে আবারও ফিরে আসে। জরুরি কাজে বাইরে গেলেও ব্যথা শুরু হওয়ায় দ্রুত বাসায় ফিরতে হয়। বলতে গেলে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই বিছানায় শুয়ে কাটে। রাতে ঘুমানোও কষ্টকর হয়ে পড়ে অনেক সময়। এভাবে মৃত্যুযন্ত্রণা সহ্য করে জীবন কাটছে আমার।'

দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা