• বুধবার   ০৮ জুলাই ২০২০ ||

  • আষাঢ় ২৩ ১৪২৭

  • || ১৭ জ্বিলকদ ১৪৪১

১১৮

বিশেষ প্রতিবেদন

অল্প শিক্ষায় বেশি বেতন!

দৈনিক গাইবান্ধা

প্রকাশিত: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

জরুরি নিয়োগ। যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি বা এসএসসি পাস। সপ্তাহে কাজ মাত্র তিন দিন। বেতন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। লোভনীয় এমন সব চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রায়ই চোখে পড়ে রাজধানীর জনবহুল স্থানের দেয়াল, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা গণপরিবহনে। এছাড়া পত্রিকার পাতায় দেখা যায় এমন অনেক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি।

লাখ লাখ বেকারের এ দেশে চাকরি যেখানে সোনার হরিণ সেখানে মাত্র অষ্টম শ্রেণি বা এসএসসি পাসে কিভাবে দেবে এত টাকা বেতনের চাকরি! এ রহস্য জানতে অনুসন্ধানের প্রাথমিক পর্যায়ে জানা যায়, এ ধরনের চাকরি দাতাদের সবাই ভুয়া। শিক্ষিত বেকারদের সরলতাকে পুঁজি করে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। রাজধানী ছাপিয়ে এখন জেলা শহরেও ফাঁদ পেতেছে এসব প্রতারক চক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য মতে, রাজধানী ও জেলা শহরে সক্রিয় রয়েছে এ ধরনের শতাধিক চক্র।

অনুসন্ধানে প্রতারিত অনেক শিক্ষিত যুবকের খোঁজ মেলে। লোভনীয় চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখে পল্টনে ‘অরবিট’ নামে একটি অফিসে যান ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী আল-আমিন। প্রথমে রেজিস্ট্রেশনের কথা বলে ওই অফিসের লোকজন তার কাছ থেকে নেয় তিনশ’ টাকা। পরে প্রশিক্ষণের কথা বলে সাত হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। পরের মাসে চাকরিতে যোগদানের জন্য গিয়ে আর কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি।

প্রতারণার শিকার আল-আমিন ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, তার পড়াশোনার খরচ পরিবার থেকে চালানো কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। তাই একটা চাকরি খুব প্রয়োজন ছিল। চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখে পল্টনের ‘অরবিট’ নামের অফিসে গিয়ে প্রতারণার শিকার হই। পল্টনের ওই অফিসের স্থান রাতারাতিই পরিবর্তন করে ফেলেছে চক্রটি। সেখানে সায়রা সিকিউরিটি নামের অপর একটি কোম্পানি অফিস করে বসে রয়েছে।

এ ধরনের প্রতারণার শিকার অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র বিকট হোসেন। তিনি পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে বড়। বাবা-মায়ের অভাবের সংসারে টানাপোড়েন ভীষণ নাড়া দেয় তাকে। সংসারের হাল ধরতে চাকরির খোঁজে বিভিন্ন কোম্পানি ও ব্যক্তির দ্বারস্থ হন তিনি। বন্ধুর মাধ্যমে সন্ধান মিলে চাকরির। ভালো চাকরি, থাকা-খাওয়ার সু-ব্যবস্থা আছে, তাই জামানত হিসেবে লাগবে ৫০ হাজার টাকা। তিন মাস পর প্রশিক্ষণ শেষে টাকা ফেরত দেয়া হবে বলে জানানো হয়। নওগাঁ থেকে মায়ের শেষ সম্বল সোনার চেইন ও কানের দুল বিক্রি করে গাজীপুরে আসেন তিনি। মাত্র সপ্তাহ খানেকের মধ্যে বুঝতে পারেন তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। সম্প্রতি এমন অভিযোগ উঠেছে লাইফওয়ে বাংলাদেশ লিমিটেড নামে এক কোম্পানির বিরুদ্ধে।

এভাবে বেকার যুবক আর শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে চাকরি দেয়ার নামে চলছে প্রতারণা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এমন প্রায় ১০০টি প্রতারক চক্র সক্রিয় রয়েছে। যারা প্রতি মাসে অফিসের নাম পরিবর্তন করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করছে। হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে এমন প্রতারণা চালিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা অনেকটাই নির্বিকার।

অপর ভুক্তভোগী মোহাম্মদ ইত্তাহাদুল হক কোমল ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, তিনি তার ছোট ভাইয়ের জন্য একটা চাকরি খুঁজছিলেন। হঠাৎ তার দীর্ঘদিনের পরিচিত এক বন্ধুর সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, একটি ভালো মার্কেটিং পদে চাকরি রয়েছে। শর্ত হলো ওই চাকরি পেতে হলে আগেই জামানত স্বরূপ গুণতে হবে ৪৫ হাজার টাকা। তিন মাস পর ট্রেনিং শেষে ওই টাকা ফেরত দেয়া হবে বলে জানান। জামানতের টাকা নিলেও দেয়া হয়নি কোনো রসিদ। টাকা দেয়ার পরেই লাপাত্তা সেই বন্ধু ও প্রতিষ্ঠান। সেখানে গিয়ে খোঁজ করলে বলে তারা অফিস ছেড়ে দিয়েছে।

নাম পরিচয় গোপন রেখে চাকরি প্রত্যাশী সেজে একটি কোম্পানিতে গেলে ভালো চাকরির প্রস্তাব দেয়া হয়। বলা হয় এসএসসি পাসেই এমন চাকরি কোথাও পাবেন না ইত্যাদি। পরে বলা হয় ফরম, প্রশিক্ষণ বাবদ তাদের অগ্রিম দিতে হবে ২০ হাজার টাকা। অগ্রিম টাকা দেয়ার আগে কোথায় ডিউটি, কি ডিউটি তা পরিষ্কার করা হবে না।

দু’দিন পরেই এমন কয়েকজন ভুক্তভোগীকে নিয়ে যাওয়া হয় মহাখালীর ডিওএইচএসের একটি অফিসে। সেখানে গিয়ে দেখা যায় অফিসের নাম ও স্টাফ পরিবর্তন হয়ে গেছে। নতুন নাম দিয়ে নতুনভাবে প্রতারণা করছে তারা। অনুসন্ধানে প্রতারিত হওয়া ভুক্তভোগীদের অভিযোগের সত্যতা মিলে যায়।

কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, রাজনৈতিক ও সাংবাদিক পরিচয়ে কিছু ব্যক্তি পেছন থেকে এই অসাধু চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। এরা যেসব এলাকায় অফিস নেয় তার আশপাশের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের হাত করে ফেলেন। তাদের অফিসের সাজ-সজ্জা দেখলে প্রতারক ভাবার কোনো সুযোগ নেই। তারা আরো জানায়, প্রতারণার শিকার বেশির ভাগ আমাদের মত গ্রাম থেকে আসা যুবক। তাই তাদের প্রতারণার ফাঁদ বোঝা আমাদের জন্য কষ্টকর।

ভুয়া চাকরির বিজ্ঞপ্তি ও প্রতারণা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতারক চক্রের কয়েকজন সদস্য বলেন, আমরা কোনো প্রতারণা করি না। আপনারা যাদের কথা বলছেন তারা অফিস পরিবর্তন করে চলে গেছে। অরবিট নামের কোনো কোম্পানির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেই। আমরা সায়রা সিকিউরিটি সার্ভিস চালাই।

এ বিষয়ে সচেতন ব্যক্তিরা বলেন, এমন লোভনীয় বিজ্ঞপ্তি দেখে যারা প্রতারিত হচ্ছেন তাদের বুঝতে হবে দেশে গ্রাজুয়েশন শেষ করা যুবকের অভাব নেই। তাদের মধ্যে অনেকে ১০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করছেন। আর কি করে এসএসসি পাস করে ২০ হাজার টাকা বেতন পাবেন- এইটা চিন্তা করলেই তো প্রতারণার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

প্রতারণার হাত থেকে বাঁচতে সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার আহবান জানিয়েছেন ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের ডিসি মো. মাসুদুর রহমান। ভুয়া চাকরির বিজ্ঞপ্তি ও প্রতারণা সম্পর্কে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি এমন প্রতারণার শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন তাহলে পুলিশের কাছে অভিযোগ দেন। এরপর পুলিশ আইনানুগ পদক্ষেপ নিয়ে প্রতারক চক্রের সদস্যদের শাস্তির ব্যবস্থা করবে।

দৈনিক গাইবান্ধা
দৈনিক গাইবান্ধা
পাঠকের চিন্তা বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর